সিরাজদ্দৌলা (শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত)

শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশের সম্পূর্ণ আলোচনা, চরিত্র বিশ্লেষণ, সারাংশ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) দশম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজদ্দৌলা'-এর লাইনভিত্তিক সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা, সারাংশ, চরিত্র বিশ্লেষণ এবং পরীক্ষার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ, Broad ও ব্যাকরণ) বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. নাট্যাংশের বিষয়সংক্ষেপ ও পটভূমি

পটভূমি: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত 'সিরাজদ্দৌলা' ঐতিহাসিক নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যটি আমাদের পাঠ্যাংশ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সময়কাল ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ, পলাশির যুদ্ধের ঠিক প্রাক্কাল। নবাব সিরাজদ্দৌলা একদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রাসন এবং অন্যদিকে নিজের দরবারের অমাত্যদের (মীরজাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ প্রমুখ) ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ হয়ে এক চরম সংকটময় মুহূর্ত পার করছেন।

বিষয়সংক্ষেপ: দরবার কক্ষে নবাব সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি ওয়াটসকে আলিনগরের সন্ধির শর্ত ভঙ্গের দায়ে এবং তাঁর বিরুদ্ধে অমাত্যদের উসকানি দেওয়ার প্রমাণসহ (অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে লেখা চিঠি) দরবার থেকে বহিষ্কার করেন। এরপর ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা-কে তিনি জানান যে, ফরাসিদের প্রতি তাঁর পূর্ণ সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করতে তিনি অক্ষম। লা আক্ষেপ করে বলেন যে ফরাসিরা বাংলা ছেড়ে গেলে নবাবের জন্য বড়ো বিপদ ঘনিয়ে আসবে।

এরপর শুরু হয় দরবারের দেশীয় অমাত্যদের সঙ্গে সিরাজের মানসিক দ্বন্দ্ব। জগৎশেঠ, মীরজাফর ও রাজবল্লভ ক্রমাগত নবাবকে অপমান ও কটূক্তি করেন। সিরাজ তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, বাংলার মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য আজ হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি তাঁর নিজের দোষ স্বীকার করে তাঁদের কাছে বাংলার এই দুর্দিনে সাহায্যের জন্য কাতর আবেদন জানান। নবাবের এই দেশপ্রেম ও আবেগময় আবেদনে মীরজাফর ও অন্যান্য সেনাপতিরা নবাবকে সাহায্যের শপথ নেন এবং পলাশির প্রান্তরে সৈন্য সমাবেশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

দরবার ভঙ্গের পর সিরাজের মাসি ঘসেটি বেগমের প্রবেশ ঘটে। ঘসেটি বেগম তাঁর পালিত পুত্রকে সিংহাসন না দেওয়ায় এবং তাঁকে বন্দিনী করে রাখায় সিরাজের প্রতি চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেন। সিরাজ ও তাঁর স্ত্রী লুৎফার শত অনুনয় সত্ত্বেও ঘসেটি সিরাজের পতন ও মৃত্যুর ভয়ংকর অভিশাপ দিয়ে চলে যান। পরিশেষে, এক বছর রাজত্ব করার তিক্ত অভিজ্ঞতা ও আসন্ন পলাশির যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে লুৎফার কাছে সিরাজ তাঁর বুকভরা বেদনা ও হতাশা প্রকাশ করেন।

২. লেখক পরিচিতি

শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৯২-১৯৬১): জন্ম অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্গত খুলনায়। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। শিক্ষক সখারাম গণেশ দেউস্করের কাছে সাংবাদিকতার পাঠ নেন। পরে 'বৈকালী', 'বিজলী', 'আত্মশক্তি' প্রভৃতি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি তাঁর কালজয়ী নাটকগুলি লিখেছিলেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য নাটকগুলির মধ্যে রয়েছে- 'সিরাজদ্দৌলা', 'গৈরিক পতাকা', 'রক্তকমল', 'সংগ্রাম ও শান্তি', 'ধাত্রী পান্না', 'এই স্বাধীনতা', 'রাষ্ট্রবিপ্লব' প্রভৃতি। তাঁর নাটকের প্রধান গুণ স্বাদেশিকতা এবং জাতীয়তাবোধ।

৩. নাট্যাংশের গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিস্তারিত ব্যাখ্যা

তুমি জান যে কলকাতা জয় করে সেই নগরের নাম আমরা আলিনগর রাখি।
ব্যাখ্যা: সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি ওয়াটসকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলেছেন। ইংরেজরা সিরাজের বিনা অনুমতিতে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার করলে, সিরাজ কলকাতা আক্রমণ করে তা দখল করেন এবং দাদু আলিবর্দী খাঁর নামানুসারে কলকাতার নাম পরিবর্তন করে রাখেন 'আলিনগর'। এই ঐতিহাসিক পটভূমির কথাই এখানে স্মরণ করানো হয়েছে।
বাংলায় আমি এমন আগুন জ্বালাইব, যাহা গঙ্গার সমস্ত জল দিয়াও নিভানো যাইবে না।
ব্যাখ্যা: এটি অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের লেখা একটি চিঠির বাংলা তরজমা, যা মুন্সিজি দরবারে পড়ে শোনাচ্ছিলেন। ওয়াটসন ইংরেজদের সামরিক শক্তির দম্ভ দেখিয়ে এই হুমকি দিয়েছিলেন যে, মাদ্রাজ থেকে আরও সৈন্য ও জাহাজ এলে তারা বাংলায় এমন ভয়ংকর যুদ্ধ বা ধ্বংসলীলা (আগুন) চালাবে, যা নবাবের পক্ষে সামলানো বা নেভানো অসম্ভব হবে।
নবাবের উপর নির্ভর করা অসম্ভব। চন্দননগর আক্রমণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ব্যাখ্যা: এটি দরবারে উপস্থিত ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটস-এর নিজের হাতে লেখা চিঠির বাংলা তরজমা। ওয়াটস সিরাজের দরবারে থেকেও সিরাজের বিরুদ্ধেই গোপনে ষড়যন্ত্র করছিলেন। তিনি ইংরেজদের উপদেশ দিচ্ছিলেন যে সিরাজের কথায় বিশ্বাস না করে, ফরাসিদের বাণিজ্যকেন্দ্র চন্দননগর দখল করে নেওয়াই শ্রেয়। এটি ছিল সিরাজের প্রতি ইংরেজদের চরম বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ।
আমার মন্ত্রিমণ্ডলও যুদ্ধের পক্ষপাতী নন। এরূপ অবস্থায়, তোমাদের প্রতি আমার অন্তরের পূর্ণ সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও, আমি তোমাদের জন্যে ইংরেজদের সঙ্গে বিবাদে প্রবৃত্ত হতে পারি না।
ব্যাখ্যা: ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা যখন ইংরেজদের হাত থেকে চন্দননগর রক্ষার জন্য সিরাজের সাহায্য প্রার্থনা করেন, তখন সিরাজ এই অসহায়তার কথা জানান। কলকাতা ও পূর্ণিয়ার যুদ্ধে তাঁর প্রচুর লোকক্ষয় ও অর্থব্যয় হয়েছে এবং মীরজাফরের মতো বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রীরা আর যুদ্ধ চাইছেন না। তাই ইচ্ছা থাকলেও ফরাসিদের সাহায্য করে ইংরেজদের সাথে নতুন করে বিবাদে জড়াতে সিরাজ অক্ষম ছিলেন।
পাপ যে চাপা থাকে না, হোসেনকুলী প্রাণ দিয়ে তা বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।
ব্যাখ্যা: রাজবল্লভ যখন বলেন যে "পাপ কখনও চাপা থাকে না", তখন সিরাজ এই কড়া জবাব দেন। হোসেনকুলী খাঁ ছিলেন ঢাকার শাসনকর্তা, যিনি সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করায় তাঁকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছিল। সিরাজ রাজবল্লভকে হোসেনকুলীর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন যে, রাজবল্লভ ও তাঁর সঙ্গীরা যে গোপনে ষড়যন্ত্র (পাপ) করছেন, তা সিরাজ জানেন এবং এর পরিণাম তাঁদের জন্যও ভালো হবে না।
রাজা রাজবল্লভকে আমরা চিনি। তিনি কাঁচা কাজ করেন না।
ব্যাখ্যা: মীরজাফরের কাছে লেখা ওয়াটসের গোপন চিঠি ধরা পড়ার পর, রাজবল্লভ ব্যঙ্গ করে জানতে চান তাঁর কোনো গোপন লিপি ধরা পড়েছে কি না। সিরাজ তখন এই মন্তব্য করেন। এর অর্থ হলো, রাজবল্লভ অত্যন্ত ধূর্ত এবং বুদ্ধিমান। তিনি মীরজাফরের মতো কোনো প্রমাণ বা গোপন চিঠি হাতে রাখেন না (কাঁচা কাজ করেন না), যা দিয়ে তাঁকে সহজে ধরা যায়।
বিপদে আপন-জন জেনে বুকে ভরসা নিয়ে যার কাছে দাঁড়ানো যায় সেই না আত্মীয়।
ব্যাখ্যা: সিরাজ তাঁর প্রধান সেনাপতি ও আত্মীয় মীরজাফরকে উদ্দেশ্য করে এই আবেগপূর্ণ কথাটি বলেছেন। যখন দরবারের সকলে সিরাজের বিরুদ্ধে, তখন বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার এই দুর্দিনে সিরাজ মীরজাফরের কাছে সাহায্য ও ভরসা চাইছেন। তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বিপদের দিনে যে পাশে দাঁড়ায়, সেই প্রকৃত আত্মীয়।
বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়-মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।
ব্যাখ্যা: সিরাজদ্দৌলা রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, দুর্লভরায় প্রমুখ হিন্দু অমাত্যদের উদ্দেশ্যে এই অবিস্মরণীয় দেশপ্রেমমূলক উক্তিটি করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে বাংলা কারও একক সম্পত্তি নয়। 'গুলবাগ' অর্থাৎ ফুলের বাগানের মতো এই সুন্দর বাংলা হলো হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই মাতৃভূমি। তাই বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী; শুধু সুপ্ত সন্তান-শিয়রে রুদ্যমানা জননী নিশাবসানের অপেক্ষায় প্রহর গণনায় রত।
ব্যাখ্যা: সিরাজ বাংলার তৎকালীন সংকটময় পরিস্থিতির এক করুণ ও কাব্যিক চিত্র তুলে ধরেছেন। ইংরেজদের আগ্রাসনে বাংলার স্বাধীনতা বা সৌভাগ্য-সূর্য আজ ডুবে যাওয়ার মুখে (অস্তাচলগামী)। বাংলার সাধারণ মানুষ (সন্তান) এই বিপদের কথা না জেনে ঘুমিয়ে আছে, আর জন্মভূমি বাংলা (জননী) তাঁর সন্তানদের শিয়রে বসে কাঁদছেন এবং এই পরাধীনতার অন্ধকার রাত (নিশাবসান) কেটে গিয়ে কবে নতুন ভোরের আলো ফুটবে, তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
আমার রাজ্য নাই, তাই আমার কাছে রাজনীতিও নাই-আছে শুধু প্রতিহিংসা।
ব্যাখ্যা: সিরাজের মাসি ঘসেটি বেগম এই কথাটি বলেছেন। ঘসেটির পালিত পুত্র শওকতজঙ্গকে সিংহাসন না দেওয়ায় এবং সিরাজ তাঁর মতিঝিলের প্রাসাদ ও সম্পদ কেড়ে নিয়ে তাঁকে বন্দিনী করে রাখায় ঘসেটির মনে রাজ্যের প্রতি আর কোনো মায়া ছিল না। সিরাজকে সিংহাসন থেকে টেনে নামানোর এবং ধ্বংস করার তীব্র প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধস্পৃহাই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ।
লাখে লাখে পলাশ-ফুলের অগ্নি-বরণে কোনোদিন হয়তো পলাশির প্রান্তর রাঙা হয়ে থাকত, তাই আজও তার বুকে রক্তের তৃষা।
ব্যাখ্যা: নাটকের একেবারে শেষে লুৎফার কাছে সিরাজ এই আক্ষেপ করেছেন। পলাশি প্রান্তরের নামকরণ হয়েছিল সেখানে থাকা লক্ষ লক্ষ লাল পলাশ ফুলের জন্য, যা দেখতে আগুনের মতো (অগ্নি-বরণ) লাগত। সিরাজের মনে হচ্ছে, পলাশির সেই লাল রঙের প্রতি আসক্তি বা তৃষ্ণা আজও মেটেনি, তাই সে আজ ফুলের রঙের বদলে মানুষের রক্ত দিয়ে নিজেকে রাঙাতে চাইছে। এটি আসন্ন পলাশির যুদ্ধের ভয়াবহ রক্তপাত ও ধ্বংসের এক অশুভ ইঙ্গিত বা পূর্বলক্ষণ।

৪. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ৫০+ টি প্রশ্ন

১. 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশটির রচয়িতা কে?
(ক) দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (খ) শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (গ) গিরিশচন্দ্র ঘোষ (ঘ) উৎপল দত্ত
উত্তর: (খ) শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
২. কলকাতা জয় করে সিরাজদ্দৌলা কলকাতার কী নাম রেখেছিলেন?
(ক) সিরাজ নগর (খ) আলিনগর (গ) মুর্শিদাবাদ (ঘ) ফোর্ট উইলিয়াম
উত্তর: (খ) আলিনগর
৩. সিরাজের দরবারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি কে ছিলেন?
(ক) ক্লাইভ (খ) ওয়াটসন (গ) ওয়াটস (ঘ) ড্রেক
উত্তর: (গ) ওয়াটস
৪. "কোম্পানি সন্ধি-সর্ত রক্ষা না করলে... তোমাকে আমরা তোপের মুখে উড়িয়ে দিতে পারি" - কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে?
(ক) মঁসিয়ে লা-কে (খ) মীরজাফরকে (গ) ওয়াটসকে (ঘ) ক্লাইভকে
উত্তর: (গ) ওয়াটসকে
৫. ওয়াটসনের চিঠির বাংলা তরজমা কে পড়ে শুনিয়েছিলেন?
(ক) মীরমদন (খ) মুন্সিজি (গ) মোহনলাল (ঘ) গোলাম হোসেন
উত্তর: (খ) মুন্সিজি
৬. ওয়াটসন তাঁর চিঠিতে বাংলায় কী জ্বালাবেন বলে হুমকি দিয়েছিলেন?
(ক) মশাল (খ) আলো (গ) আগুন (ঘ) প্রদীপ
উত্তর: (গ) আগুন
৭. সেই আগুন কী দিয়েও নেভানো যাবে না বলে ওয়াটসন লিখেছিলেন?
(ক) বৃষ্টির জল দিয়ে (খ) গঙ্গার সমস্ত জল দিয়াও (গ) সমুদ্রের জল দিয়ে (ঘ) যমুনার জল দিয়ে
উত্তর: (খ) গঙ্গার সমস্ত জল দিয়াও
৮. "নবাবের উপর নির্ভর করা অসম্ভব। চন্দননগর আক্রমণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।" - চিঠিটি কে লিখেছিল?
(ক) ওয়াটসন (খ) ক্লাইভ (গ) ওয়াটস (ঘ) পিদু
উত্তর: (গ) ওয়াটস
৯. সিরাজ ওয়াটসকে কী শাস্তি দিয়েছিলেন?
(ক) ফাঁসি (খ) তোপের মুখে উড়ানো (গ) এই মুহূর্তে দরবার ত্যাগ করার নির্দেশ (ঘ) বন্দি করা
উত্তর: (গ) এই মুহূর্তে দরবার ত্যাগ করার নির্দেশ
১০. ফরাসিদের প্রতিনিধি হয়ে দরবারে কে উপস্থিত ছিলেন?
(ক) ডুুপ্লে (খ) মঁসিয়ে লা (গ) সিনফ্রে (ঘ) রেনল্ট
উত্তর: (খ) মঁসিয়ে লা
১১. ইংরেজরা সিরাজের সম্মতি না নিয়ে ফরাসিদের কোন বাণিজ্যকুঠি অধিকার করেছিল?
(ক) চুঁচুড়া (খ) হুগলি (গ) চন্দননগর (ঘ) শ্রীরামপুর
উত্তর: (গ) চন্দননগর
১২. সিরাজ কেন ফরাসিদের সাহায্য করতে পারেননি?
(ক) ফরাসিদের তিনি ঘৃণা করতেন (খ) তাঁর মন্ত্রিমণ্ডল যুদ্ধের পক্ষপাতী ছিলেন না এবং অনেক লোকক্ষয় ও অর্থব্যয় হয়েছিল (গ) ইংরেজদের তিনি ভয় পেতেন (ঘ) তাঁর কাছে সৈন্য ছিল না
উত্তর: (খ) তাঁর মন্ত্রিমণ্ডল যুদ্ধের পক্ষপাতী ছিলেন না এবং অনেক লোকক্ষয় ও অর্থব্যয় হয়েছিল
১৩. "I know we shall never meet." - উক্তিটি কার?
(ক) ওয়াটসের (খ) ক্লাইভের (গ) মঁসিয়ে লা-র (ঘ) সিরাজের
উত্তর: (গ) মঁসিয়ে লা-র
১৪. "আমাকে কোনো কথা বলেই লাভ নেই-সর্ব-চিকিৎসার বাইরে আমি!" - উক্তিটি কার?
(ক) রাজবল্লভের (খ) সিরাজের (গ) জগৎশেঠের (ঘ) মীরজাফরের
উত্তর: (খ) সিরাজের
১৫. সিরাজের মতে, তাঁর সহিষুতাই কাদের স্পর্ধা বাড়িয়ে দিয়েছে?
(ক) ইংরেজদের (খ) ফরাসিদের (গ) জগৎশেঠ প্রমুখ অমাত্যদের (ঘ) সাধারণ প্রজার
উত্তর: (গ) জগৎশেঠ প্রমুখ অমাত্যদের
১৬. "পাপ যে চাপা থাকে না, ................. প্রাণ দিয়ে তা বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।" - শূন্যস্থানে কার নাম বসবে?
(ক) শওকতজঙ্গ (খ) আলিবর্দী খাঁ (গ) হোসেনকুলী (ঘ) সিরাজদ্দৌলা
উত্তর: (গ) হোসেনকুলী
১৭. তরবারি স্পর্শ করে সিরাজের স্বপক্ষে অস্ত্র ধারণ না করার শপথ কে নিয়েছিলেন?
(ক) রাজবল্লভ (খ) জগৎশেঠ (গ) রায়দুর্লভ (ঘ) মীরজাফর
উত্তর: (ঘ) মীরজাফর
১৮. পূর্ণিয়ার যুদ্ধে কাকে হত্যা করা হয়েছিল?
(ক) হোসেনকুলীকে (খ) অপদার্থ শওকতজঙ্গকে (গ) ঘসেটি বেগমকে (ঘ) মোহনলালকে
উত্তর: (খ) অপদার্থ শওকতজঙ্গকে
১৯. সিরাজের সেনাপতি কে ছিলেন, যাকে মীরজাফর অর্বাচীন বলেছিলেন?
(ক) মীরমদন ও মোহনলাল (খ) ইয়ারলতিফ (গ) সিনফ্রে (ঘ) ঘসেটি বেগম
উত্তর: (ক) মীরমদন ও মোহনলাল
২০. দরবার ত্যাগ করতে হলে কার অনুমতি নিতে হয়?
(ক) সিপাহসালার (খ) নবাবের (গ) জগৎশেঠের (ঘ) রাজবল্লভের
উত্তর: (খ) নবাবের
২১. ওয়াটস মীরজাফরের কাছে কার মারফৎ গোপন পত্র পাঠিয়েছিলেন?
(ক) মুন্সিজির (খ) খোজা পিদুর (গ) উমিচাঁদের (ঘ) ক্লাইভের
উত্তর: (খ) খোজা পিদুর
২২. সিরাজের মতে কে 'কাঁচা কাজ' করেন না?
(ক) মীরজাফর (খ) রাজা রাজবল্লভ (গ) জগৎশেঠ (ঘ) রায়দুর্লভ
উত্তর: (খ) রাজা রাজবল্লভ
২৩. "আজ বিচারের দিন নয়, ............. স্থাপনের দিন!" - শূন্যস্থানে কী হবে?
(ক) শান্তি (খ) যুদ্ধ (গ) সৌহার্দ্য (ঘ) সন্ধি
উত্তর: (গ) সৌহার্দ্য
২৪. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে আপোষে নিষ্পত্তির কথা কে বলেছিলেন?
(ক) মীরজাফর (খ) রাজা রাজবল্লভ (গ) জগৎশেঠ (ঘ) মীরমদন
উত্তর: (খ) রাজা রাজবল্লভ
২৫. সিরাজ কাকে তাঁর 'পরম আত্মীয়' বলে উল্লেখ করেছেন?
(ক) মোহনলালকে (খ) মীরমদনকে (গ) জাফর আলি খাঁ-কে (ঘ) ঘসেটি বেগমকে
উত্তর: (গ) জাফর আলি খাঁ-কে
২৬. সিরাজের মতে এই বাংলা কাদের মিলিত মাতৃভূমি গুলবাগ?
(ক) ইংরেজ ও ফরাসির (খ) শুধু মুসলমানের (গ) শুধু হিন্দুর (ঘ) মিলিত হিন্দু-মুসলমানের
উত্তর: (ঘ) মিলিত হিন্দু-মুসলমানের
২৭. "জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ ............." - কী?
(ক) উদীয়মান (খ) অস্তাচলগামী (গ) মেঘাচ্ছন্ন (ঘ) উজ্জ্বল
উত্তর: (খ) অস্তাচলগামী
২৮. "সুপ্ত সন্তান-শিয়রে রুদ্যমানা জননী" - এখানে জননী কে?
(ক) ঘসেটি বেগম (খ) আমিনা (গ) বাংলা মা বা মাতৃভূমি (ঘ) লুৎফা
উত্তর: (গ) বাংলা মা বা মাতৃভূমি
২৯. শেষ পর্যন্ত কে সিরাজের সহায়তার শপথ নিয়েছিলেন?
(ক) জগৎশেঠ (খ) রাজবল্লভ (গ) মীরজাফর (ঘ) ঘসেটি বেগম
উত্তর: (গ) মীরজাফর
৩০. "তাঁর আদেশে হাসিমুখেই মৃত্যুকে বরণ করব।" - কার উক্তি?
(ক) মীরমদন (খ) মোহনলাল (গ) গোলাম হোসেন (ঘ) সিনফ্রে
উত্তর: (ক) মীরমদন
৩১. সিরাজের গুপ্তচরের নাম কী ছিল?
(ক) মুন্সিজি (খ) খোজা পিদু (গ) গোলামহোসেন (ঘ) মীরমদন
উত্তর: (গ) গোলামহোসেন
৩২. কোম্পানির ফৌজ কোন দিকে এগিয়ে আসছিল?
(ক) মুর্শিদাবাদ (খ) পলাশি (গ) চন্দননগর (ঘ) আলিনগর
উত্তর: (খ) পলাশি
৩৩. "সিংহাসন কি টলছে?" - সিরাজ কাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন?
(ক) লুৎফাকে (খ) ঘসেটিকে (গ) গোলামহোসেনকে (ঘ) মীরজাফরকে
উত্তর: (গ) গোলামহোসেনকে
৩৪. "ওখানে কী দেখচ মূর্খ, বিবেকের দিকে চেয়ে দ্যাখো!" - উক্তিটি কার?
(ক) সিরাজের (খ) লুৎফার (গ) ঘসেটি বেগমের (ঘ) আমিনার
উত্তর: (গ) ঘসেটি বেগমের
৩৫. ঘসেটি বেগম সিরাজের কে ছিলেন?
(ক) মা (খ) পিসি (গ) মাসি (ঘ) দিদি
উত্তর: (গ) মাসি
৩৬. কোম্পানির ফৌজ কার অভিমুখে অভিযান করেছিল বলে ঘসেটিকে সিরাজ জানান?
(ক) কলকাতা (খ) কাশিমবাজার (গ) পূর্ণিয়া (ঘ) চন্দননগর
উত্তর: (খ) কাশিমবাজার
৩৭. ঘসেটি বেগমের কাছে এখন কী অবশিষ্ট আছে?
(ক) রাজ্য (খ) রাজনীতি (গ) শুধু প্রতিহিংসা (ঘ) সম্পদ
উত্তর: (গ) শুধু প্রতিহিংসা
৩৮. ঘসেটি বেগমের পালিত পুত্রের নাম কী ছিল?
(ক) শওকতজঙ্গ (খ) এক্রামউদ্দৌলা (গ) সিরাজ (ঘ) মীরমদন
উত্তর: (ক) শওকতজঙ্গ
৩৯. ঘসেটি বেগমের প্রাসাদের নাম কী ছিল যা সিরাজ অধিকার করেছিলেন?
(ক) হীরাঝিল (খ) মতিঝিল (গ) হাজারদুয়ারি (ঘ) ফোর্ট উইলিয়াম
উত্তর: (খ) মতিঝিল
৪০. সিরাজের স্ত্রীর নাম কী?
(ক) ঘসেটি (খ) আমিনা (গ) লুৎফা (লুৎফুন্নিসা) (ঘ) ফতেমা
উত্তর: (গ) লুৎফা (লুৎফুন্নিসা)
৪১. ঘসেটি বেগম লুৎফাকে কী বলে কটাক্ষ করেছিলেন?
(ক) রানি (খ) নবাব-মহিষী বা বাঁদি (গ) দাসী (ঘ) কন্যা
উত্তর: (খ) নবাব-মহিষী বা বাঁদি
৪২. ঘসেটি বেগম কোথায় বন্দিনী ছিলেন?
(ক) মতিঝিলে (খ) পাপ-পুরীতে (সিরাজের প্রাসাদে) (গ) কাশিমবাজারে (ঘ) পূর্ণিয়ায়
উত্তর: (খ) পাপ-পুরীতে (সিরাজের প্রাসাদে)
৪৩. সিরাজ ঘসেটি বেগমকে কোথায় স্থান দেওয়ার ভয় দেখিয়েছিলেন?
(ক) মতিঝিলে (খ) কারাগারে (গ) দিল্লিতে (ঘ) রাস্তায়
উত্তর: (খ) কারাগারে
৪৪. ঘসেটি বেগমের মতে কে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হবে?
(ক) লুৎফা (খ) আমিনা (সিরাজের মা) (গ) ঘসেটি নিজে (ঘ) সিরাজ
উত্তর: (খ) আমিনা (সিরাজের মা)
৪৫. লুৎফার মতে কার দৃষ্টিতে আগুন আর নিশ্বাসে বিষ?
(ক) মীরজাফরের (খ) ক্লাইভের (গ) ঘসেটি বেগমের (ঘ) সিরাজের
উত্তর: (গ) ঘসেটি বেগমের
৪৬. সিরাজ কত মাস রাজত্ব করছেন?
(ক) দশ মাস (খ) বারো মাস (গ) পনেরো মাস (ঘ) আঠেরো মাস
উত্তর: (গ) পনেরো মাস
৪৭. এই পনেরো মাসের নবাবি সিরাজের কীভাবে কেটেছে?
(ক) শান্তিতে (খ) যুদ্ধে, ষড়যন্ত্রভেদে, গুপ্তচর পরিচালনায় (গ) বিলাসে (ঘ) শিকারে
উত্তর: (খ) যুদ্ধে, ষড়যন্ত্রভেদে, গুপ্তচর পরিচালনায়
৪৮. সিরাজের মতে পলাশির মাঠে কী রঙের ফুল ফোটে?
(ক) সাদা (খ) নীল (গ) অগ্নি-বরণ বা রাঙা (লাল) (ঘ) হলুদ
উত্তর: (গ) অগ্নি-বরণ বা রাঙা (লাল)
৪৯. সিরাজের মতে পলাশির বুকে কীসের তৃষা আছে?
(ক) জলের তৃষা (খ) রক্তের তৃষা (গ) প্রেমের তৃষা (ঘ) ক্ষমতার তৃষা
উত্তর: (খ) রক্তের তৃষা
৫০. শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা একটি বিখ্যাত নাটকের নাম কী?
(ক) নবান্ন (খ) গৈরিক পতাকা (গ) নীলদর্পণ (ঘ) টিনের তলোয়ার
উত্তর: (খ) গৈরিক পতাকা

৫. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ৪০+ টি প্রশ্ন

১. 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশটির রচয়িতা কে?
উত্তর: 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশটির রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত বাঙালি নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত।
২. কলকাতা জয় করে সিরাজ তার কী নাম রেখেছিলেন এবং কেন?
উত্তর: কলকাতা জয় করে সিরাজ তার নাম রেখেছিলেন 'আলিনগর', তাঁর দাদু নবাব আলিবর্দী খাঁর নামানুসারে।
৩. ওয়াটসকে কেন মুর্শিদাবাদে রাখা হয়েছিল?
উত্তর: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যাতে আলিনগরের সন্ধির সকল শর্ত সঠিকভাবে রক্ষা করে, তার প্রতিভূ বা প্রতিনিধি হিসেবে ওয়াটসকে মুর্শিদাবাদে রাখা হয়েছিল।
৪. সিরাজ কেন ওয়াটসকে তোপের মুখে উড়ানোর কথা বলেছিলেন?
উত্তর: সিরাজ বলেছিলেন যে, কোম্পানি যদি সন্ধির শর্ত রক্ষা না করে বা ভঙ্গ করে, তবে যুদ্ধ ঘোষণার আগেই ওয়াটসকে তিনি তোপের মুখে উড়িয়ে দিতে পারেন।
৫. "তোমাদের অপরাধ, সভ্যতার, শিষ্টাচারের সীমা অতিক্রম করেচে।" - অপরাধটি কী ছিল?
উত্তর: ইংরেজরা সিরাজের বিনা অনুমতিতে চন্দননগর আক্রমণ করে এবং ওয়াটস দরবারে থেকে সিরাজের বিরুদ্ধেই গোপনে ষড়যন্ত্র ও উসকানি দেওয়ার মতো অভদ্র ও অসভ্য আচরণ করেছিল।
৬. অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের চিঠিতে কী ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল?
উত্তর: ওয়াটসনের চিঠিতে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল যে, মাদ্রাজ থেকে আরও সৈন্য ও জাহাজ এলে তারা বাংলায় এমন আগুন জ্বালাবে যা গঙ্গার সমস্ত জল দিয়েও নেভানো যাবে না।
৭. ওয়াটস তাঁর নিজের লেখা চিঠিতে ইংরেজদের কী উপদেশ দিয়েছিলেন?
উত্তর: ওয়াটস উপদেশ দিয়েছিলেন যে নবাবের উপর নির্ভর করা অসম্ভব, তাই ইংরেজদের পক্ষে ফরাসিদের বাণিজ্যকেন্দ্র চন্দননগর আক্রমণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
৮. সিরাজ ওয়াটসকে কী শাস্তি দিলেন?
উত্তর: সিরাজ ওয়াটসকে অবিলম্বে তাঁর দরবার ত্যাগ করার এবং ভবিষ্যতে আর কখনো দরবারে স্থান না পাওয়ার নির্দেশ দিয়ে শাস্তি দিয়েছিলেন।
৯. ফরাসিদের প্রতিনিধি হয়ে কে দরবারে এসেছিলেন এবং কেন?
উত্তর: ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা দরবারে এসেছিলেন ইংরেজদের চন্দননগর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য নবাবের সাহায্য ও প্রতিকার চাইতে।
১০. সিরাজ কেন ফরাসিদের সাহায্য করতে পারলেন না?
উত্তর: কলকাতা ও পূর্ণিয়ার যুদ্ধে নবাবের প্রচুর লোকক্ষয় ও অর্থব্যয় হয়েছিল এবং তাঁর মন্ত্রিমণ্ডল নতুন করে যুদ্ধের পক্ষপাতী ছিলেন না, তাই তিনি ফরাসিদের সাহায্য করতে পারেননি।
১১. "I know we shall never meet." - মঁসিয়ে লা কেন এ কথা বলেছিলেন?
উত্তর: মঁসিয়ে লা বুঝতে পেরেছিলেন যে ফরাসিরা বাংলা ছেড়ে গেলে ইংরেজরা নবাবকে ধ্বংস করবে এবং নবাবের পতন অনিবার্য, তাই তাঁদের আর কখনো দেখা হবে না।
১২. "আমাকে কোনো কথা বলেই লাভ নেই-সর্ব-চিকিৎসার বাইরে আমি!" - সিরাজ কেন এ কথা বলেছেন?
উত্তর: রাজবল্লভের মতো ষড়যন্ত্রকারী অমাত্যদের ভণ্ডামির প্রতি ব্যঙ্গ করে এবং নিজের অসহায়তা ও তাঁদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতেই সিরাজ এ কথা বলেছেন।
১৩. জগৎশেঠের মতে সিরাজের কোন আচরণ তাঁদের স্পর্ধা বাড়িয়ে দিয়েছে?
উত্তর: জগৎশেঠের মতে সিরাজের উপদ্রব বা অত্যাচারই তাঁদের স্পর্ধা বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সিরাজের মতে তাঁর সহিষ্ণুতাই তাঁদের স্পর্ধার কারণ।
১৪. হোসেনকুলী কে ছিলেন এবং তাঁর কী পরিণতি হয়েছিল?
উত্তর: হোসেনকুলী ছিলেন ঢাকার শাসনকর্তা। তিনি সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র (পাপ) করায় সিরাজ তাঁকে প্রকাশ্য রাস্তায় হত্যা করেছিলেন।
১৫. মীরজাফর কী শপথ নিয়েছিলেন?
উত্তর: মীরজাফর তরবারি স্পর্শ করে শপথ নিয়েছিলেন যে, নবাব যদি মানী-লোকদের (অমাত্যদের) এভাবে অপমান করেন, তবে তিনি নবাবের স্বপক্ষে কখনো অস্ত্র ধারণ করবেন না।
১৬. মোহনলাল মীরজাফরের কোন গর্বকে খর্ব করেছিলেন?
উত্তর: মোহনলাল মীরজাফরকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, পূর্ণিয়ার যুদ্ধে অপদার্থ শওকতজঙ্গকে হত্যা করার সামান্য কৃতিত্ব ছাড়া তিনি নবাবের কোনো বড়ো সাহায্য করেননি।
১৭. "দরবার ত্যাগ করতে হলে নবাবের অনুমতি নিতে হয়" - সিরাজ এ কথা কাদের বলেছিলেন?
উত্তর: সিরাজের কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে যখন মীরজাফর, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ ও দুর্লভরায় দরবার ত্যাগ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তখন সিরাজ তাঁদের এ কথা বলেছিলেন।
১৮. সিরাজ মীরজাফরের কোন গোপন খবর ফাঁস করে দিয়েছিলেন?
উত্তর: সিরাজ ফাঁস করে দিয়েছিলেন যে, খোজা পিদুর মারফৎ ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটস মীরজাফরের কাছে একটি গোপন ষড়যন্ত্রের পত্র পাঠিয়েছিলেন যা নবাবের হস্তগত হয়েছে।
১৯. সিরাজ কেন মীরজাফরকে ওয়াটসের পত্রটি পড়তে দিলেন না?
উত্তর: সিরাজ বলেছিলেন যে পত্রটি পড়তে দিলে যে উদ্দেশ্যে (ষড়যন্ত্রের) পত্রটি পাঠানো হয়েছিল, তা সিদ্ধ বা সফল হবে, তাই তিনি সেটি পড়তে দেননি।
২০. "রাজা রাজবল্লভকে আমরা চিনি। তিনি কাঁচা কাজ করেন না।" - 'কাঁচা কাজ' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'কাঁচা কাজ' বলতে প্রমাণ বা চিঠি রেখে ষড়যন্ত্র করার বোকামিকে বোঝানো হয়েছে। রাজবল্লভ অত্যন্ত ধূর্ত, তাই তিনি মীরজাফরের মতো চিঠি চালাচালি করে ধরা পড়েন না।
২১. "আজ বিচারের দিন নয়, সৌহার্দ্য স্থাপনের দিন!" - সিরাজ এ কথা কেন বলেছিলেন?
উত্তর: ইংরেজদের আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সিরাজ তাঁর বিশ্বাসঘাতক অমাত্যদের দোষ ভুলে গিয়ে তাঁদের সাথে ঐকবদ্ধ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিলেন।
২২. সিরাজ কাদের 'পরম আত্মীয়' বলে মনে করতেন?
উত্তর: সিরাজ মনে করতেন যে, বিপদে আপন-জন জেনে বুকে ভরসা নিয়ে যার কাছে দাঁড়ানো যায়, সেই-ই প্রকৃত পরম আত্মীয়। তিনি মীরজাফরকেও তাঁর পরম আত্মীয় বলেছিলেন।
২৩. "মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।" - 'গুলবাগ' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'গুলবাগ' শব্দের অর্থ হলো ফুলের বাগান। বাংলাকে ফুলের বাগানের মতোই সুন্দর ও পবিত্র বলে বোঝানো হয়েছে।
২৪. "জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী" - কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: কথাটির অর্থ হলো, ইংরেজদের আগ্রাসন এবং দেশীয় অমাত্যদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে বাংলার স্বাধীনতা এবং সৌভাগ্য আজ ডুবে যাওয়ার বা ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছে।
২৫. সিরাজের আবেগপূর্ণ আহ্বানে মীরজাফর কী শপথ করেছিলেন?
উত্তর: সিরাজের আহ্বানে মীরজাফর শপথ করেছিলেন যে, আজ থেকে সর্বসময়ে সর্বক্ষেত্রে তিনি নবাব সিরাজদ্দৌলার সহায়তা করবেন।
২৬. "তাঁর আদেশে হাসিমুখেই মৃত্যুকে বরণ করব।" - কে, কার আদেশে?
উত্তর: নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি মীরমদন, প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের আদেশ সম্পর্কে এই কথা বলেছিলেন।
২৭. পলাশির প্রান্তরে সৈন্য সমাবেশের জন্য সিরাজ কাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন?
উত্তর: সিরাজ মীরজাফরের আদেশে রায়দুর্লভ, ইয়ারলতিফ, মোহনলাল, মীরমদন এবং সিনফ্রেকে নিজ নিজ সৈন্যবাহিনী নিয়ে পলাশি প্রান্তরে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
২৮. "সিংহাসন কি টলছে?" - সিরাজ কেন গোলামহোসেনকে এ কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন?
উত্তর: চারদিকের ষড়যন্ত্র, ইংরেজদের আক্রমণ এবং অমাত্যদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে সিরাজ মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন বলেই তাঁর মনে হয়েছিল সিংহাসন যেন টলছে।
২৯. "ওখানে কী দেখচ মূর্খ, বিবেকের দিকে চেয়ে দ্যাখো!" - ঘসেটি বেগম কেন এ কথা বলেছিলেন?
উত্তর: ঘসেটি বেগম বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, সিংহাসন টলছে কি না তা না দেখে, সিরাজ যেন নিজের বিবেকের দিকে তাকান, কারণ তাঁর পাপ ও অত্যাচারের জন্যই তাঁর আজ এই দুর্দশা।
৩০. ঘসেটি বেগম সিরাজের কে ছিলেন এবং তাঁর ক্ষোভের কারণ কী ছিল?
উত্তর: ঘসেটি বেগম ছিলেন সিরাজের মাসি। সিরাজ ঘসেটির পালিত পুত্রকে সিংহাসন না দিয়ে ঘসেটির মতিঝিল প্রাসাদ ও সম্পদ লুঠ করে তাঁকে বন্দিনী করে রেখেছিলেন, এটাই তাঁর ক্ষোভের কারণ।
৩১. ঘসেটি বেগমের কাছে রাজনীতির পরিবর্তে কী অবশিষ্ট ছিল?
উত্তর: ঘসেটি বেগমের রাজ্য ও ক্ষমতা কিছুই ছিল না, তাই তাঁর কাছে রাজনীতির কোনো স্থান ছিল না, ছিল কেবল সিরাজকে ধ্বংস করার তীব্র প্রতিহিংসা।
৩২. সিরাজের স্ত্রীর নাম কী এবং তিনি ঘসেটিকে কী বলে ডাকতেন?
উত্তর: সিরাজের স্ত্রীর নাম লুৎফা (লুৎফুন্নিসা) এবং তিনি ঘসেটি বেগমকে সম্মান করে 'মা' বলে ডাকতেন।
৩৩. ঘসেটি বেগম লুৎফাকে কী অভিশাপ দিয়েছিলেন?
উত্তর: ঘসেটি বেগম অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, দুদিন বাদে সিরাজের পতন হলে লুৎফাকেও নবাব-মহিষী থেকে বাঁদি বা দাসীতে পরিণত হতে হবে এবং ঘসেটির মতোই কেঁদে জীবন কাটাতে হবে।
৩৪. ঘসেটি বেগমের মতে কে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হবে?
উত্তর: ঘসেটি বেগমের মতে, সিরাজের পতন ও মৃত্যুর পর সিরাজের মা আমিনা বেগম কেঁদে কেঁদে অন্ধ হবেন।
৩৫. সিরাজ কেন ঘসেটি বেগমের কণ্ঠ রোধ করতে পারছিলেন না?
উত্তর: সিরাজের কথায়, তিনি কঠোর নন এবং পরের ব্যথায় তাঁর প্রাণ কেঁদে ওঠে বলেই তিনি মাসি ঘসেটি বেগমের কণ্ঠ রোধ করতে বা তাঁকে শাস্তি দিতে পারছিলেন না।
৩৬. লুৎফার মতে ঘসেটি বেগমের নিশ্বাস ও দৃষ্টি কেমন?
উত্তর: লুৎফার মতে ঘসেটি বেগমের নিশ্বাসে বিষ, দৃষ্টিতে আগুন এবং তাঁর অঙ্গ-সঞ্চালনে যেন ভূমিকম্প লুকিয়ে আছে।
৩৭. সিরাজ কত মাস রাজত্ব করছিলেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
উত্তর: সিরাজ মাত্র পনেরো মাস রাজত্ব করছিলেন এবং এই সময়ের মধ্যে তিনি মানুষের এত নির্মমতা ও বিশ্বাসঘাতকতা দেখেছেন যে, কোনো মানুষকে শ্রদ্ধা করতে বা ভালোবাসতে তাঁর ভয় হয়।
৩৮. "পলাশি, রাক্ষসী পলাশি!" - সিরাজ পলাশিকে রাক্ষসী বলেছেন কেন?
উত্তর: সিরাজের মনে হয়েছিল যে পলাশির প্রান্তরে আসন্ন যুদ্ধে প্রচুর মানুষের প্রাণ যাবে। পলাশির প্রান্তর যেন মানুষের রক্ত পান করার তৃষ্ণায় রাক্ষসীর মতো অপেক্ষা করছে, তাই তিনি তাকে রাক্ষসী বলেছেন।
৩৯. "লাখে লাখে পলাশ-ফুলের অগ্নি-বরণে" - পলাশির প্রান্তরের এই বর্ণনার তাৎপর্য কী?
উত্তর: এর তাৎপর্য হলো, পলাশির মাঠ একসময় লাল পলাশ ফুলে ভরে থাকত যা আগুনের মতো লাগত। আজ সেই ফুল নেই, কিন্তু সেই লাল রঙের তৃষ্ণা মেটাতে পলাশি আজ মানুষের রক্ত চাইছে।
৪০. শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটকের নাম লেখো।
উত্তর: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক হলো 'গৈরিক পতাকা'।

৬. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ১০ টি প্রশ্ন

১. 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশ অবলম্বনে সিরাজদ্দৌলার চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশে নবাব সিরাজদ্দৌলার চরিত্রটি একজন দেশপ্রেমিক, আবেগপ্রবণ এবং ট্র্যাজিক নায়ক হিসেবে ফুটে উঠেছে। তাঁর চরিত্রের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো:

১. বলিষ্ঠ শাসক ও কূটনীতিজ্ঞ: নাটকের শুরুতেই আমরা দেখি সিরাজ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটসকে তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণসহ দরবার থেকে বহিষ্কার করছেন। তিনি ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা-কেও অত্যন্ত কূটনীতির সাথে বুঝিয়ে বিদায় দেন যে বর্তমানে ফরাসিদের সাহায্য করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
২. অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক: সিরাজের মধ্যে তীব্র স্বদেশপ্রেম বর্তমান। তিনি মীরজাফর, রাজবল্লভদের মনে করিয়ে দেন যে বাংলা হিন্দু বা মুসলমানের একক সম্পত্তি নয়, এটি মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি 'গুলবাগ'। বাংলাকে বিদেশির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি নিজের ক্ষমতা ছাড়তেও রাজি ছিলেন।
৩. ক্ষমাশীল ও আবেগপ্রবণ: সিরাজ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করা সত্ত্বেও তিনি মীরজাফর বা জগৎশেঠদের শাস্তি দেননি, বরং মাতৃভূমি রক্ষার স্বার্থে তাঁদের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করেছেন। মাসি ঘসেটি বেগমের চরম অভিশাপ শুনেও তিনি তাঁকে শাস্তি দিতে পারেননি, কারণ তিনি কঠোর ছিলেন না এবং পরের ব্যথায় তাঁর প্রাণ কাঁদত।
৪. নিঃসঙ্গ ও হতাশ: পনেরো মাসের নবাবি জীবনে চারপাশের মানুষের নির্মমতা ও ষড়যন্ত্র দেখে সিরাজ অত্যন্ত নিঃসঙ্গ ও হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি লুৎফাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি আর কোনো মানুষকে বিশ্বাস করতে বা ভালোবাসতে পারেন না। সার্বিকভাবে সিরাজদ্দৌলা ছিলেন এমন একজন দেশপ্রেমিক শাসক, যিনি ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ হয়ে করুণ পরিণতির দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

২. "বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়-মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।" - এই উক্তিটির আলোকে সিরাজদ্দৌলার দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দাও।

উত্তর: উক্তিটির প্রসঙ্গ: 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশে যখন বাংলার আকাশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আক্রমণের ঘনঘটা এবং দরবারের অমাত্যরা (মীরজাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ প্রমুখ) নিজেদের স্বার্থে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার তাগিদে নবাব সিরাজদ্দৌলা এই অবিস্মরণীয় উক্তিটি করেছিলেন।

দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা: এই উক্তিটির মধ্যে দিয়ে সিরাজদ্দৌলার গভীর দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে। আঠারো শতকের সেই যুগে দাঁড়িয়ে সিরাজ বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি দেশকে রক্ষা করতে হলে তার সকল ধর্মের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি জগৎশেঠ ও রাজবল্লভদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে বাংলা কেবল মুসলমানদের বা নবাবের নিজস্ব সম্পত্তি নয়। এই বাংলা হলো 'গুলবাগ' অর্থাৎ একটি সুন্দর ফুলের বাগান, যা হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েরই মাতৃভূমি। তিনি নিজের ভুল ত্রুটির কথা স্বীকার করে বলেন যে তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয়ের কাছেই অপরাধ করেছেন এবং উভয়ের কাছ থেকেই আঘাত পেয়েছেন, তাই তিনি কোনো পক্ষপাতিত্ব করেননি। বাংলার স্বাধীনতা যখন অস্তাচলগামী, তখন ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে মাতৃভূমিকে রক্ষা করাই সকলের একমাত্র ধর্ম হওয়া উচিত। সিরাজের এই আবেদন প্রমাণ করে যে তিনি একজন প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমিক শাসক ছিলেন।

৩. "আমার রাজ্য নাই, তাই আমার কাছে রাজনীতিও নাই-আছে শুধু প্রতিহিংসা।" - বক্তা কে? তাঁর এই প্রতিহিংসার কারণ কী?

উত্তর: বক্তা: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশে উদ্ধৃত কথাটির বক্তা হলেন সিরাজের মাসি ঘসেটি বেগম।

প্রতিহিংসার কারণ: ঘসেটি বেগম ছিলেন নবাব আলিবর্দী খাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা। তাঁর প্রবল বাসনা ছিল তাঁর পালিত পুত্র শওকতজঙ্গকে বাংলার নবাব করার। কিন্তু সিরাজদ্দৌলা সিংহাসনে বসায় তাঁর সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। শওকতজঙ্গকে পূর্ণিয়ার যুদ্ধে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয়, সিরাজ ঘসেটি বেগমের প্রচুর ধনরত্ন ও সম্পদে ভরা 'মতিঝিল' প্রাসাদ অধিকার করে নেন এবং ঘসেটি বেগমকে সেখান থেকে জোর করে নিয়ে এসে নিজের প্রাসাদে নজরবন্দি (বন্দিনী) করে রাখেন।
যে নারীর একসময় বিপুল সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল, সিরাজের কারণে আজ তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব, গৃহহারা এবং দাসীর মতো জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর পালিত পুত্রের মৃত্যু এবং নিজের এই চরম লাঞ্ছনা ও বন্দিদশা ঘসেটি বেগমের মনে সিরাজের প্রতি এক তীব্র ঘৃণার জন্ম দিয়েছিল। রাজ্য ও ক্ষমতা হারিয়ে তাঁর মনে রাজনীতির আর কোনো জায়গা ছিল না, তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল সিরাজের পতন ও ধ্বংস দেখা। এই তীব্র প্রতিশোধস্পৃহাই তাঁর প্রতিহিংসার মূল কারণ।

৪. "জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী; শুধু সুপ্ত সন্তান-শিয়রে রুদ্যমানা জননী নিশাবসানের অপেক্ষায় প্রহর গণনায় রত।" - উক্তিটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উক্তিটির প্রসঙ্গ: 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশে পলাশির যুদ্ধের ঠিক প্রাক্কালে, দেশীয় অমাত্যদের ষড়যন্ত্র এবং ইংরেজদের আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সিরাজদ্দৌলা মীরজাফরদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে গিয়ে এই আবেগপূর্ণ উক্তিটি করেছেন।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: এই উক্তিটিতে সিরাজ এক চরম রূপক ও কাব্যিক চিত্র তুলে ধরেছেন। 'জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী' বলতে তিনি বুঝিয়েছেন যে, বাংলার স্বাধীনতা, গৌরব এবং সমৃদ্ধি আজ চরম সংকটের মুখে এবং তা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিদেশি ইংরেজ শক্তির আক্রমণে বাংলার পরাধীনতা প্রায় নিশ্চিত।
দ্বিতীয় অংশে, 'সুপ্ত সন্তান' বলতে বাংলার সেইসব সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছে, যারা আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও ঘুমন্ত অবস্থায় আছে। আর 'রুদ্যমানা জননী' হলেন স্বয়ং বাংলা মা বা মাতৃভূমি। বিদেশী শক্তির আস্ফালন এবং নিজের ঘরের সন্তানদের (মীরজাফর, জগৎশেঠদের মতো অমাত্যদের) বিশ্বাসঘাতকতা দেখে মাতৃভূমি আজ কাঁদছেন। পরাধীনতার এই গভীর অন্ধকার রাত্রি (নিশা) কবে কেটে গিয়ে স্বাধীনতার নতুন ভোর আসবে, বাংলা মা শিয়রে বসে সেই প্রতীক্ষাতেই প্রহর গুনছেন। এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে সিরাজের গভীর মাতৃভক্তি এবং আসন্ন পরাধীনতার আশঙ্কায় তাঁর হাহাকার অত্যন্ত মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে।

৫. সিরাজদ্দৌলা ও মীরজাফরের মধ্যে দরবারে যে বাদানুবাদ এবং শেষ পর্যন্ত যে সমঝোতা হয়েছিল, তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

উত্তর: 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশের দরবার কক্ষে সিরাজ এবং প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের মধ্যে এক চরম মানসিক সংঘাত ও বাদানুবাদের চিত্র দেখা যায়।

বাদানুবাদ: সিরাজ যখন জগৎশেঠ ও রাজবল্লভদের চক্রান্তের কথা তুলছিলেন, তখন মীরজাফর নবাবকে বলেন যে তিনি মানী-লোকদের অপমান করছেন। মীরজাফর তরবারি ছুঁয়ে শপথ করেন যে নবাব এভাবে অপমান করলে তিনি নবাবের পক্ষে আর অস্ত্র ধরবেন না। এর উত্তরে মোহনলাল ও মীরমদন মীরজাফরকে অপদার্থ বলে তাঁর বীরত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ক্ষুব্ধ মীরজাফর তখন দরবার ত্যাগ করার হুমকি দেন। এই সময় সিরাজ মীরজাফরের একটি চরম গোপন খবর ফাঁস করে দেন যে, ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটসের সাথে মীরজাফর গোপন পত্রালাপ ও ষড়যন্ত্র করছেন।

সমঝোতা: মীরজাফরের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হাতে থাকা সত্ত্বেও সিরাজ তাঁকে শাস্তি দেননি। কারণ সিরাজ জানতেন সামনে পলাশির যুদ্ধ এবং মীরজাফরের সেনাদলের সাহায্য ছাড়া ইংরেজদের হারানো অসম্ভব। তাই সিরাজ তাঁর সমস্ত অহংকার ত্যাগ করে মীরজাফরের কাছে সৌহার্দ্য স্থাপনের আবেদন করেন। তিনি মীরজাফরকে তাঁর 'পরম আত্মীয়' বলে উল্লেখ করে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সাহায্য ভিক্ষা করেন। সিরাজের এই আবেগপূর্ণ ও দেশপ্রেমমূলক আহ্বানে মীরজাফর শেষ পর্যন্ত সম্মত হন এবং শপথ নেন যে তিনি সর্বসময়ে ও সর্বক্ষেত্রে নবাবকে সাহায্য করবেন।

৬. "পলাশি! লাখে লাখে পলাশ-ফুলের অগ্নি-বরণে কোনোদিন হয়তো পলাশির প্রান্তর রাঙা হয়ে থাকত, তাই আজও তার বুকে রক্তের তৃষা।" - সিরাজের এই উক্তির মধ্য দিয়ে কোন আশঙ্কার প্রকাশ ঘটেছে?

উত্তর: উক্তিটির প্রসঙ্গ: 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশের একেবারে শেষে, স্ত্রী লুৎফার সাথে কথোপকথনের সময় সিরাজদ্দৌলা আসন্ন পলাশির যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে এই হতাশা ও আশঙ্কাপূর্ণ উক্তিটি করেছিলেন।

আশঙ্কার প্রকাশ: 'পলাশি' নামটির উৎপত্তি হয়েছে পলাশ ফুল থেকে। একসময় এই প্রান্তর লক্ষ লক্ষ লাল রঙের পলাশ ফুলে ভোরে থাকত, যা দেখতে ঠিক আগুনের শিখার মতো (অগ্নি-বরণ) মনে হতো। কিন্তু এখন আর সেখানে সেই পলাশ ফুলের লাল রং নেই। সিরাজের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে, পলাশির মাঠ হয়তো তার সেই হারিয়ে যাওয়া লাল রঙের শূন্যতা মেটাতে আজ মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর তাই সে লাল ফুলের বদলে মানুষের লাল রক্তের তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে। সিরাজ বুঝতে পারছিলেন যে পলাশির প্রান্তরে ইংরেজদের সাথে যে যুদ্ধ হতে চলেছে, তা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী। মীরজাফরদের মতো ঘরের শত্রুদের চক্রান্তে এই যুদ্ধে তাঁর পতন এবং বহু সাধারণ সৈনিকের মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। পলাশির মাটি যে মানুষের রক্তে রাঙা হয়ে এক মহাশ্মশানে পরিণত হবে, সিরাজের এই উক্তিটি সেই আসন্ন ধ্বংস, মৃত্যু এবং পরাধীনতারই এক অশুভ পূর্বাভাস বা আশঙ্কাকে ফুটিয়ে তুলেছে।

৭. 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশে ঘসেটি বেগম চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশে ঘসেটি বেগম একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নেতিবাচক চরিত্র। তাঁর চরিত্রে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি ফুটে উঠেছে:

১. চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ: ঘসেটি বেগমের চরিত্রের প্রধান দিক হলো তাঁর জ্বলন্ত প্রতিহিংসা। সিরাজ তাঁর পালিত পুত্রকে সিংহাসন না দেওয়ায় এবং তাঁর ধনসম্পদ কেড়ে নিয়ে তাঁকে বন্দিনী করায়, তিনি সিরাজের চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। তাঁর কাছে রাজ্য বা রাজনীতির কোনো মূল্য নেই, সিরাজের পতন দেখাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
২. স্পষ্টবাদিনী ও নির্ভীক: ঘসেটি বেগম অত্যন্ত নির্ভীক। স্বয়ং নবাবের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নবাবকে 'দস্যু' বলতে বা তাঁর পতন কামনা করতে পিছপা হননি। তাঁর মুখের ভাষা তীরের মতো তীক্ষ্ণ এবং বিষাক্ত।
৩. ক্ষমাহীন ও হৃদয়হীনা: লুৎফা ও সিরাজ তাঁকে বারবার শান্ত হওয়ার অনুরোধ করলেও তিনি কাউকেই ক্ষমা করতে প্রস্তুত নন। লুৎফাকে তিনি অভিশাপ দেন যে সিরাজের মৃত্যুর পর লুৎফাকেও তাঁর মতোই কেঁদে জীবন কাটাতে হবে এবং সিরাজের মা আমিনা কেঁদে কেঁদে অন্ধ হবে। তাঁর মধ্যে কোনো মাতৃসুলভ স্নেহ বা মায়া অবশিষ্ট ছিল না, তিনি যেন এক মূর্তিমতী দানবীতে পরিণত হয়েছিলেন।

৮. "আজ বিচারের দিন নয়, সৌহার্দ্য স্থাপনের দিন!" - কে, কাকে, কেন এ কথা বলেছিলেন?

উত্তর: কে ও কাকে: 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা তাঁর প্রধান সেনাপতি মীরজাফর এবং দরবারের অন্যান্য অমাত্যদের (জগৎশেঠ, রাজবল্লভ প্রমুখ) উদ্দেশ্য করে এ কথা বলেছিলেন।

কেন বলেছিলেন: দরবারে যখন সিরাজ মীরজাফরের কাছে ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটসের লেখা গোপন চিঠি ফাঁস করে দেন, তখন মীরজাফর ভয় পেয়ে যান এবং জানতে চান যে নবাব প্রকাশ্য দরবারেই তাঁর বিচার করতে চান কি না। এর উত্তরে সিরাজ আলোচ্য উক্তিটি করেন।
সিরাজ জানতেন যে মীরজাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভরা তাঁর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি চাইলে নবাব হিসেবে তখনই তাঁদের কঠিন শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড দিতে পারতেন। কিন্তু সিরাজের লক্ষ্য ছিল অন্য। ইংরেজদের সামরিক বাহিনী তখন বাংলার দিকে ধেয়ে আসছিল এবং সামনেই ছিল পলাশির যুদ্ধ। এই দুর্দিনে দেশের প্রধান সেনাপতি ও অমাত্যদের শাস্তি দিলে বাংলার সামরিক শক্তি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ত এবং ইংরেজদের জয় নিশ্চিত হতো। তাই মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে সিরাজ তাঁর ব্যক্তিগত অপমান ও ক্রোধ ভুলে যান। তিনি দোষীদের বিচার বা শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে তাঁদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক (সৌহার্দ্য) স্থাপন করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, যাতে সমবেত শক্তিতে ইংরেজদের প্রতিহত করা যায়।

৯. "মাত্র পনেরোটি মাস আমি রাজত্ব করচি, লুৎফা!" - এই পনেরো মাসের রাজত্বে সিরাজের কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল?

উত্তর: সিরাজদ্দৌলা বাংলার নবাব হিসেবে মাত্র পনেরো মাস সিংহাসনে বসেছিলেন। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের রাজত্বকাল তাঁর কাছে কোনো সুখ বা বিলাসিতার ছিল না, বরং তা ছিল চরম তিক্ততা ও সংগ্রামের।

এই পনেরো মাসের মধ্যে প্রায় পুরো একটি বছর তাঁকে কাটাতে হয়েছে যুদ্ধ করে, শত্রুদের ষড়যন্ত্র ভেদ করে এবং গুপ্তচর পরিচালনা করে। সিংহাসনে বসার পর থেকেই তিনি ঘরের শত্রু (ঘসেটি বেগম, শওকতজঙ্গ) এবং বাইরের শত্রু (ইংরেজ) দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। তিনি দেখেছেন কীভাবে তাঁর নিজের মন্ত্রী ও সেনাপতিরা (মীরজাফর, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ) সামান্য ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য দেশের স্বাধীনতাকে বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার চক্রান্ত করেছে। মানুষের চরম স্বার্থপরতা, বিশ্বাসঘাতকতা, এবং নির্মমতার পরিচয় তিনি এত গভীরভাবে পেয়েছেন যে, মানবজাতির ওপর থেকে তাঁর বিশ্বাস সম্পূর্ণ উঠে গেছে। এই পনেরো মাসের তিক্ত অভিজ্ঞতায় তিনি এমন এক নিঃসঙ্গ অবস্থায় পৌঁছেছেন যেখানে কোনো মানুষকে তিনি আর শ্রদ্ধা করতে পারেন না, ভালোবাসতেও পারেন না। সিংহাসনের এই কণ্টকময় যন্ত্রণাই তাঁর অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠেছে।

১০. সিরাজদ্দৌলা ও ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা-র মধ্যে কথোপকথনের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশে ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা এবং নবাব সিরাজদ্দৌলার কথোপকথনটি তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সিরাজের অসহায়তার এক স্পষ্ট দলিল।

ফরাসিরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় বাণিজ্য করছিল এবং তারা নবাবের প্রতি অনুগত ছিল। কিন্তু ইংরেজরা সিরাজের সম্মতি ছাড়াই ফরাসিদের চন্দননগরের বাণিজ্যকুঠি দখল করে নেয়। মঁসিয়ে লা যখন এর প্রতিকার চাইতে আসেন, তখন সিরাজ তাঁর অসহায়তা প্রকাশ করেন। সিরাজ জানান যে, কলকাতা জয়ে তাঁর প্রচুর লোকক্ষয় ও অর্থব্যয় হয়েছে এবং তাঁর দেশীয় অমাত্যরা যুদ্ধের বিপক্ষে। তাই ফরাসিদের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও তিনি ইংরেজদের সাথে নতুন করে বিবাদে জড়াতে পারছেন না।
এই কথোপকথন থেকে স্পষ্ট হয় যে সিরাজ তখন নিজের দরবারেই ক্ষমতাহীন এবং দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন। অন্যদিকে, মঁসিয়ে লা যাওয়ার আগে নবাবকে সতর্ক করে দেন যে, ফরাসিরা বাংলা ছেড়ে চলে গেলে ইংরেজদের আস্ফালন আরও বাড়বে এবং তারা নবাবকে ধ্বংস করবে। মঁসিয়ে লা-র এই ভবিষ্যদ্বাণী এবং সিরাজের অসহায়তা আসন্ন পলাশির যুদ্ধের এক অশনি সংকেত হিসেবেই নাটকে উপস্থাপিত হয়েছে।

৭. ব্যাকরণ ও নির্মিতি (Grammar) ১০+ টি প্রশ্ন

কারক ও অকারক সম্পর্ক

  • কলকাতা জয়ে যখন আমরা যাত্রা করি... - কর্ম কারকে 'শূন্য' বিভক্তি।
  • মাদ্রাজ পাঠাইয়া সংবাদ দিব... - অধিকরণ কারকে 'শূন্য' বিভক্তি (স্থান বোঝাচ্ছে)।
  • গঙ্গার সমস্ত জল দিয়াও নিভানো যাইবে না। - সম্বন্ধ পদে 'র' বিভক্তি (অকারক)।
  • তরবারি স্পর্শ করে আমি শপথ করচি... - কর্ম কারকে 'শূন্য' বিভক্তি।
  • লোভে পড়ে মানুষ অনেক সময় অনেক অন্যায় কাজে প্রবৃত্ত হয়। - করণ কারকে 'এ' বিভক্তি (লোভের দ্বারা)।
  • লুৎফা ছুটিয়া আসিল। - কর্তৃকারকে 'শূন্য' বিভক্তি।

সমাস নির্ণয়

  • সিরাজদ্দৌলা: সিরাজ উদ্-দৌলা (রাজ্যের প্রদীপ) - (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)।
  • শান্তিভঙ্গ: শান্তির ভঙ্গ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)।
  • দেশপ্রেম: দেশের প্রতি প্রেম (নিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস) / দেশের প্রেম (ষষ্ঠী)।
  • রাজদ্রোহ: রাজার প্রতি দ্রোহ (নিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস)।
  • হিন্দু-মুসলমান: হিন্দু ও মুসলমান (দ্বন্দ্ব সমাস)।
  • অস্তাচলগামী: অস্তাচলের দিকে গামী (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)।

বাক্য ও বাচ্য পরিবর্তন

  • বাক্য: কলকাতা জয় করে সেই নগরের নাম আমরা আলিনগর রাখি। (জটিল বাক্যে)
    উত্তর: যখন আমরা কলকাতা জয় করি, তখন সেই নগরের নাম আমরা আলিনগর রাখি।
  • বাক্য: আমি নির্বোধ, অত্যাচারী, বিলাস-সর্বস্ব। (নেতিবাচক বা না-সূচক বাক্যে)
    উত্তর: আমি বুদ্ধিমান, দয়ালু বা ত্যাগী নই।
  • বাচ্য: আমি সকল অভিযোগ অবনত মস্তকে গ্রহণ করিচি। (কর্মবাচ্যে)
    উত্তর: আমার দ্বারা সকল অভিযোগ অবনত মস্তকে গৃহীত হয়েছে।
  • বাচ্য: একটু অপেক্ষা করুন রাজা। (ভাববাচ্যে)
    উত্তর: রাজার দ্বারা একটু অপেক্ষা করা হোক।

সিরাজদ্দৌলা নাটক সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

সিরাজদ্দৌলা নাট্যাংশটি প্রখ্যাত বাঙালি নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা।

সিরাজদ্দৌলা কলকাতা জয় করে তাঁর দাদু আলিবর্দী খাঁর নামানুসারে কলকাতার নাম রেখেছিলেন 'আলিনগর'।

ঘসেটি বেগম ছিলেন সিরাজের মাসি। সিরাজ তাঁর পালিত পুত্রকে সিংহাসন না দিয়ে তাঁর প্রাসাদ ও সম্পদ কেড়ে নিয়ে তাঁকে বন্দিনী করে রাখায় তিনি সিরাজের ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন।

সামনে পলাশির যুদ্ধ থাকায় এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে সেনাপতিদের ঐক্যের প্রয়োজন ছিল বলে সিরাজ মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাঁর বিচার করেননি, বরং তাঁকে সাহায্য করার আবেদন জানান।