অভিষেক (মাইকেল মধুসূদন দত্ত)

মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত 'মেঘনাদবধ কাব্য' থেকে সংগৃহীত 'অভিষেক' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, সারাংশ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) দশম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত 'অভিষেক' কবিতার লাইনভিত্তিক সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা, সারাংশ, এবং পরীক্ষার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ, Broad ও ব্যাকরণ) বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ

অভিষেক কবিতাটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গ ('অভিষেক') থেকে গৃহীত হয়েছে। এই কবিতায় লঙ্কার বীর যোদ্ধা ইন্দ্রজিৎ তথা মেঘনাদের দেশপ্রেম, বীরত্ব এবং সেনাপতি পদে তাঁর অভিষেকের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

প্রমোদকাননে বিলাসব্যসনে মগ্ন ইন্দ্রজিতের কাছে ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মী এসে লঙ্কার এক দুঃসংবাদ দেন। রামচন্দ্রের সাথে যুদ্ধে ইন্দ্রজিতের ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছেন এবং রাবণ নিজেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইন্দ্রজিৎ অবাক হন, কারণ তিনি রামচন্দ্রকে নিশা-যুদ্ধে খণ্ড খণ্ড করে কেটেছিলেন। মায়াবী রামচন্দ্রের পুনর্জীবনের কথা শুনে ইন্দ্রজিৎ লজ্জিত ও ক্ষুব্ধ হন। লঙ্কার এই ঘোর বিপদে নিজে প্রমোদকাননে নারীদের মাঝে থাকাটা তাঁর কাছে কলঙ্ক বলে মনে হয়।

তিনি দ্রুত যুদ্ধসাজে সজ্জিত হন। স্ত্রী প্রমীলার বিদায়বেদনা তাঁকে স্পর্শ করলেও তিনি কর্তব্যের টানে অবিচল থাকেন এবং রামচন্দ্রকে বধ করে শীঘ্র ফেরার প্রতিশ্রুতি দেন। বীরদর্পে রথে চড়ে তিনি লঙ্কায় পিতার কাছে উপস্থিত হন এবং যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চান। রাবণ পুত্রকে যুদ্ধে পাঠাতে ইতস্তত করলেও, মেঘনাদের বীরত্বব্যঞ্জক জেদের কাছে হার মানেন। পরিশেষে রাবণ ইন্দ্রজিৎকে ইষ্টদেবতার পূজা করতে বলেন এবং গঙ্গাজল দিয়ে তাঁকে সেনাপতি পদে 'অভিষেক' বা বরণ করেন।

২. কবি পরিচিতি

মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩): বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার জনক এবং অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি অধুনা বাংলাদেশের যশোহর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালেই তিনি গ্রিক, ল্যাটিন, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাঁর রচিত 'মেঘনাদবধ কাব্য' বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ সার্থক মহাকাব্য। এছাড়াও তিনি 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য', 'বীরাঙ্গনা কাব্য', 'ব্রজাঙ্গনা কাব্য' ও 'চতুর্দশপদী কবিতাবলী' রচনা করেছেন। 'শর্মিষ্ঠা', 'পদ্মাবতী', 'কৃষ্ণকুমারী' তাঁর বিখ্যাত নাটক এবং 'একেই কি বলে সভ্যতা', 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ' তাঁর রচিত প্রহসন।

৩. কবিতার লাইনভিত্তিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা

কনক-আসন ত্যজি, বীরেন্দ্রকেশরী
ইন্দ্রজিৎ, প্রণমিয়া, ধাত্রীর চরণে,
কহিলা, - "কি হেতু, মাতঃ, গতি তব আজি
এ ভবনে? কহ দাসে লঙ্কার কুশল।"
ব্যাখ্যা: প্রমোদকাননে বিলাসে মগ্ন বীরশ্রেষ্ঠ (বীরেন্দ্রকেশরী) ইন্দ্রজিৎ তাঁর সোনার (কনক) আসন ত্যাগ করে ধাত্রীমাতা প্রভাষাকে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলেন, "মা, আজ এখানে তোমার আগমনের কারণ কী? লঙ্কার খবর সব ভালো তো?" (আসলে ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মী সেখানে এসেছিলেন)।
শিরঃ চুম্বি, ছদ্মবেশী অম্বুরাশি-সুতা
উত্তরিলা;- "হায়! পুত্র, কি আর কহিব
কনক-লঙ্কার দশা! ঘোরতর রণে,
হত প্রিয় ভাই তব বীরবাহু বলী!
ব্যাখ্যা: ইন্দ্রজিতের মাথা চুম্বন করে ছদ্মবেশী সমুদ্রকন্যা (অম্বুরাশি-সুতা অর্থাৎ দেবী লক্ষ্মী) আক্ষেপের সুরে বললেন, "লঙ্কার আর কী অবস্থার কথা বলব! রামচন্দ্রের সাথে ভয়ংকর যুদ্ধে তোমার বীর ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছে।"
তার শোকে মহাশোকী রাক্ষসাধিপতি,
সসৈন্যে সাজেন আজি যুঝিতে আপনি।"
ব্যাখ্যা: পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুতে রাক্ষসরাজ রাবণ গভীর শোকে আচ্ছন্ন এবং তিনি নিজেই সৈন্যসামন্ত নিয়ে যুদ্ধ (যুঝিতে) করতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।
জিজ্ঞাসিলা মহাবাহু বিস্ময় মানিয়া; -
"কি কহিলা, ভগবতি? কে বধিল কবে
প্রিয়ানুজে? নিশা-রণে সংহারিনু আমি
রঘুবরে; খন্ড খন্ড করিয়া কাটিনু
বরষি প্রচণ্ড শর বৈরিদলে;
ব্যাখ্যা: এই অদ্ভুত সংবাদ শুনে ইন্দ্রজিৎ অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "ভগবতি, আপনি একি বলছেন? আমার প্রিয় ভাইকে কে বধ করল? আমি তো রাতের যুদ্ধে (নিশা-রণে) রামচন্দ্রকে (রঘুবরে) নিজে হত্যা করেছি। প্রচণ্ড শর বা বাণ নিক্ষেপ করে শত্রুদলকে খণ্ড খণ্ড করে কেটেছি।"
তবে
এ বারতা, এ অদ্ভুত বারতা, জননি
কোথায় পাইলে তুমি, শীঘ্র কহ দাসে।"
ব্যাখ্যা: রামচন্দ্রকে নিজে হত্যা করার পর, তার হাতে ভাই বীরবাহুর মৃত্যুর এই খবর ইন্দ্রজিতের কাছে অসম্ভব ও অদ্ভুত বলে মনে হয়েছে। তাই তিনি ধাত্রীর কাছে জানতে চাইলেন যে এই অদ্ভুত সংবাদ তিনি কোথা থেকে পেলেন।
রত্নাকর রত্নোত্তমা ইন্দিরা সুন্দরী
উত্তরিলা; - "হায়! পুত্র, মায়াবী মানব
সীতাপতি; তব শরে মরিয়া বাঁচিল।
যাও তুমি ত্বরা করি; রক্ষ রক্ষঃকুল-
মান, এ কালসমরে, রক্ষঃ- চূড়ামণি!
ব্যাখ্যা: সমুদ্রমন্থনে ওঠা রত্নদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রত্ন স্বরূপিনী ইন্দিরা (লক্ষ্মী) উত্তর দিলেন, সীতাপতি রামচন্দ্র সাধারণ মানুষ নন, তিনি হলেন মায়াবী। তাই তিনি তোমার বাণে নিহত হওয়ার পরেও পুনর্জীবন লাভ করেছেন। তিনি ইন্দ্রজিৎকে (রক্ষঃ-চূড়ামণি) অবিলম্বে লঙ্কায় গিয়ে এই ভয়ংকর যুদ্ধে (কালসমরে) রাক্ষসকুলের মান সম্মান রক্ষা করতে বললেন।
ছিঁড়িলা কুসুমদাম রোষে মহাবলী
মেঘনাদ; ফেলাইলা কনক-বলয়
দূরে; পদতলে পড়ি শোভিল কুণ্ডল,
যথা অশোকের ফুল অশোকের তলে
আভাময়!
ব্যাখ্যা: রামের পুনর্জীবনের কথা শুনে মহাবীর মেঘনাদ রাগে তাঁর গলার ফুলের মালা (কুসুমদাম) ছিঁড়ে ফেললেন এবং হাতের সোনার বালা (কনক-বলয়) দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। কানের কুণ্ডল তাঁর পায়ের তলায় পড়ে এমনভাবে শোভা পাচ্ছিল, ঠিক যেন অশোক গাছের তলায় লাল অশোক ফুল উজ্জ্বল হয়ে পড়ে আছে।
"ধিক্ মোরে" কহিলা গম্ভীরে
কুমার, "হা ধিক্ মোরে! বৈরিদল বেড়ে
স্বর্ণলঙ্কা, হেথা আমি বামাদল মাঝে?
এই কি সাজে আমারে, দশাননাত্মজ
আমি ইন্দ্রজিৎ? আন রথ ত্বরা করি;
ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে।"
ব্যাখ্যা: মেঘনাদ নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে বললেন, "শত্রুরা আজ সোনার লঙ্কা ঘিরে ফেলেছে, আর আমি এখানে নারীদের (বামাদল) মাঝে প্রমোদকাননে বিলাসে মগ্ন আছি? আমি রাবণের পুত্র (দশাননাত্মজ) ইন্দ্রজিৎ, এটা আমার মানায় না! দ্রুত রথ নিয়ে এসো, শত্রুদের বিনাশ করে আমি আমার এই অপবাদ ঘোচাব।"
সাজিলা রথীন্দ্রর্ষভ বীর-আভরণে,
হৈমবতীসুত যথা নাশিতে তারকে
মহাসুর; কিম্বা যথা বৃহন্নলারূপী
কিরীটী, বিরাটপুত্র সহ, উদ্ধারিতে
গোধন, সাজিলা শূর শমীবৃক্ষমূলে।
ব্যাখ্যা: রথীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ (রথীন্দ্রর্ষভ) ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধের জন্য বীরের সাজে সজ্জিত হলেন। তিনি এমনভাবে সাজলেন যেন দেবী দুর্গার পুত্র কার্তিকেয় (হৈমবতীসুত) তারকাসুরকে বধ করার জন্য সেজেছিলেন, অথবা মহাভারতের অর্জুন (কিরীটী) যখন বৃহন্নলার রূপ ধারণ করে বিরাট রাজার গোধন উদ্ধারের জন্য শমীবৃক্ষের তলায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সেজেছিলেন, ঠিক তেমনই।
মেঘবর্ণ রথ; চক্র বিজলীর ছটা;
ধ্বজ ইন্দ্রচাপরূপী; তুরঙ্গম বেগে
আশুগতি। রথে চড়ে বীর-চূড়ামণি
বীরদর্পে,
ব্যাখ্যা: ইন্দ্রজিতের রথের বর্ণ ছিল মেঘের মতো কালো। রথের চাকায় বিদ্যুতের (বিজলীর) ছটা। রথের পতাকা (ধ্বজ) রামধনুর (ইন্দ্রচাপ) মতো রঙিন এবং রথের ঘোড়াগুলো ছিল বাতাসের মতো দ্রুতগামী (আশুগতি)। এমন ভয়ংকর রথে বীরদর্পে চড়লেন মেঘনাদ।
হেন কালে প্রমীলা সুন্দরী,
ধরি পতি-কর-যুগ (হায় রে যেমতি
হেমলতা আলিঙ্গয়ে তরু-কুলেশ্বরে)
কহিলা কাঁদিয়া ধনি; "কোথা প্রাণসখে,
রাখি এ দাসীরে, কহ, চলিলা আপনি?
ব্যাখ্যা: ঠিক সেই সময় মেঘনাদের স্ত্রী প্রমীলা এসে স্বামীর দুই হাত ধরে ফেললেন। যেমন সোনার লতা (হেমলতা) বড়ো বনস্পতি গাছকে (তরু-কুলেশ্বর) জড়িয়ে ধরে থাকে, ঠিক তেমনই প্রমীলা ইন্দ্রজিৎকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললেন, "হে প্রাণসখা, আমাকে ফেলে রেখে তুমি কোথায় চলেছ?"
কেমনে ধরিবে প্রাণ তোমার বিরহে
এ অভাগী? হায়, নাথ, গহন কাননে,
ব্রততী বাঁধিলে সাধে করি-পদ, যদি
তার রঙ্গরসে মনঃ না দিয়া, মাতঙ্গ
যায় চলি, তবু তারে রাখে পদাশ্রয়ে
যূথনাথ। তবে কেন তুমি, গুণনিধি,
ত্যজ কিঙ্করীরে আজি?
ব্যাখ্যা: প্রমীলা আক্ষেপ করে বললেন যে স্বামীর বিরহে তিনি কীভাবে প্রাণ ধারণ করবেন! যেমন গহীন জঙ্গলে লতা (ব্রততী) যদি হাতির পা জড়িয়ে ধরে, হাতি (মাতঙ্গ বা যূথনাথ) তার দিকে মন না দিয়ে চলে গেলেও লতাকে সে তার পায়ে আশ্রয় দিয়ে রাখে। তাহলে হে গুণনিধি, তুমি কেন আজ আমাকে (কিঙ্করী বা দাসীকে) ত্যাগ করে চলে যাচ্ছ?
হাসি উত্তরিলা
মেঘনাদ, "ইন্দ্রজিতে জিতি তুমি, সতি,
বেঁধেছ যে দৃঢ় বাঁধে, কে পারে খুলিতে
সে বাঁধে? ত্বরায় আমি আসিব ফিরিয়া
কল্যাণি, সমরে নাশি, তোমার কল্যাণে
রাঘবে। বিদায় এবে দেহ, বিধুমুখি।"
ব্যাখ্যা: প্রমীলার কথায় মেঘনাদ হেসে উত্তর দিলেন, "হে সতী, যে ইন্দ্রজিৎ স্বর্গ জয় করেছে, তাকে তুমি তোমার প্রেমের জালে এমনই শক্ত করে বেঁধেছ যে, সেই বাঁধন খোলার সাধ্য কারও নেই। আমি তোমার আশীর্বাদে যুদ্ধে রামচন্দ্রকে বধ করে অতি দ্রুত ফিরে আসব। হে চাঁদমুখো (বিধুমুখি), এখন আমাকে বিদায় দাও।"
উঠিল পবন-পথে ঘোরতর রবে,
রথবর, হৈমপাখা বিস্তারিয়া যেন
উড়িলা মৈনাক-শৈল অম্বর উজলি!
শিঞ্জিনী আকর্ষি রোষে, টঙ্কারিলা ধনুঃ
বীরেন্দ্র, পক্ষীন্দ্র যথা নাদে মেঘ মাঝে
ভৈরবে। কাঁপিল লঙ্কা, কাঁপিল জলধি!
ব্যাখ্যা: মেঘনাদের রথ ভয়ংকর শব্দ করে আকাশের পথে (পবন-পথে) উড়ল। মনে হলো যেন সোনার পাখা (হৈমপাখা) বিস্তার করে মৈনাক পর্বত আকাশ (অম্বর) উজ্জ্বল করে উড়ছে। আকাশে উড়ে মেঘনাদ রাগে ধনুকের ছিলা (শিঞ্জিনী) টেনে টঙ্কার দিলেন। সেই আওয়াজ যেন মেঘের মাঝে গরুড়ের (পক্ষীন্দ্র) ভয়ংকর ডাকের মতো। মেঘনাদের ধনুকের শব্দে গোটা লঙ্কা ও সমুদ্র (জলধি) কেঁপে উঠল।
সাজিছে রাবণ রাজা, বীরমদে মাতি; -
বাজিছে রণ-বাজনা; গরজিছে গজ;
হেষে অশ্ব; হুঙ্কারিছে পদাতিক, রথী;
উড়িছে কৌশিক-ধ্বজ; উঠিছে আকাশে
কাঞ্চন-কণ্ডুক-বিভা। হেন কালে তথা,
দ্রুতগতি উতরিলা মেঘনাদ রথী।
ব্যাখ্যা: লঙ্কায় তখন রাজা রাবণ বীরদর্পে যুদ্ধের জন্য সাজছেন। যুদ্ধের বাজনা বাজছে, হাতি গর্জন করছে, ঘোড়া ডাকছে (হেষে), পদাতিক সৈন্য ও রথীরা হুংকার দিচ্ছে। রেশমি পতাকা (কৌশিক-ধ্বজ) উড়ছে এবং সৈন্যদের পরনে থাকা সোনার বর্মের (কাঞ্চন-কণ্ডুক) আলো আকাশে ছড়াচ্ছে। ঠিক এমন সময় দ্রুতগতিতে সেখানে বীর মেঘনাদ এসে পৌঁছালেন।
নাদিলা কর্তৃরদল হেরি বীরবরে
মহাগর্বে। নমি পুত্র পিতার চরণে,
করযোড়ে কহিলা;- “হে রক্ষঃ-কুল-পতি,
শুনেছি, মরিয়া না কি বাঁচিয়াছে পুনঃ
রাঘব? এ মায়া, পিতঃ, বুঝিতে না পারি!
ব্যাখ্যা: মেঘনাদকে দেখে লঙ্কার রাক্ষস সৈন্যরা (নৈর্ঋতদল) আনন্দে ও মহাগর্বে গর্জন করে উঠল। পুত্র মেঘনাদ পিতা রাবণের চরণে প্রণাম করে হাত জোড় করে বললেন, "রাক্ষসকুলের পতি, আমি শুনলাম রামচন্দ্র নাকি মরে গিয়ে আবার বেঁচে উঠেছে? পিতা, এ কেমন মায়া তা আমি বুঝতে পারছি না!"
কিন্তু অনুমতি দেহ; সমূলে নির্মূল
করিব পামরে আজি! ঘোর শরানলে
করি ভস্ম, বায়ু-অস্ত্রে উড়াইব তারে;
নতুবা বাঁধিয়া আনি দিব রাজপদে।”
ব্যাখ্যা: মেঘনাদ পিতার কাছে অনুমতি চেয়ে বললেন যে আজ তিনি সেই পাপী রামচন্দ্রকে সমূলে নির্মূল করবেন। তাকে বাণের আগুনে (শরানলে) ভস্ম করে বায়ু অস্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দেবেন, অথবা তাকে বেঁধে এনে পিতার পায়ে সমর্পণ করবেন।
আলিঙ্গি কুমারে, চুম্বি শিরঃ, মৃদুস্বরে
উত্তর করিলা তবে স্বর্ণ-লঙ্কাপতি;
"রাক্ষস-কুল-শেখর তুমি, বৎস; তুমি
রাক্ষস-কুল-ভরসা। এ কাল সমরে,
নাহি চাহে প্রাণ মম পাঠাইতে তোমা
বারম্বার। হায়, বিধি বাম মম প্রতি।
কে কবে শুনেছে, পুত্র, ভাসে শিলা জলে,
কে কবে শুনেছে, লোক মরি পুনঃ বাঁচে?"
ব্যাখ্যা: রাবণ পুত্র মেঘনাদকে জড়িয়ে ধরে এবং মাথা চুম্বন করে বললেন, "তুমি হলে রাক্ষসকুলের শ্রেষ্ঠ রত্ন (শেখর) এবং একমাত্র ভরসা। এই ভয়ংকর যুদ্ধে তোমাকে বারবার পাঠাতে আমার মন চাইছে না। আজ ভাগ্য (বিধি) আমার প্রতি বিরূপ বা বাম। পুত্র, কবে কে শুনেছে যে পাথর জলে ভাসে, আর কবেই বা কে শুনেছে যে মৃত মানুষ পুনরায় বেঁচে ওঠে?" (রামের পুনর্জীবন ও পাথর দিয়ে সেতু বাঁধার প্রতি ইঙ্গিত)।
উত্তরিলা বীরদর্পে অসুরারি-রিপু; -
"কি ছার সে নর, তারে ডরাও আপনি,
রাজেন্দ্র? থাকিতে দাস, যদি যাও রণে
তুমি, এ কলঙ্ক, পিতঃ, ঘুষিবে জগতে।
হাসিবে মেঘবাহন; রুষিবেন দেব
অগ্নি। দুই বার আমি হারানু রাঘবে;
আর একবার পিতঃ, দেহ আজ্ঞা মোরে;
দেখিব এবার বীর বাঁচে কি ঔষধে!"
ব্যাখ্যা: দেবতাদের শত্রু (অসুরারি-রিপু অর্থাৎ মেঘনাদ) বীরদর্পে উত্তর দিলেন, "রাম একজন সামান্য মানুষ, তাকে আপনি ভয় পাচ্ছেন? আমি থাকতে আপনি যদি যুদ্ধে যান, তবে জগতে এই কলঙ্ক রটবে। ইন্দ্র (মেঘবাহন) হাসবেন এবং অগ্নিদেব রেগে যাবেন। আমি দুবার রামকে হারিয়েছি, আমাকে আর একবার আদেশ দিন। এবার দেখব সে কোন ঔষধে বেঁচে ওঠে!"
কহিলা রাক্ষসপতি; - "কুম্ভকর্ণ, বলী
ভাই মম, - তায় আমি জাগানু অকালে
ভয়ে; হায়, দেহ তার, দেখ, সিন্ধু-তীরে
ভূপতিত, গিরিশৃঙ্গ কিম্বা তরু যথা
বজ্রাঘাতে! তবে যদি একান্ত সমরে
ইচ্ছা তব, বৎস, আগে পূজ ইষ্টদেবে, -
নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ কর, বীরমণি!
ব্যাখ্যা: রাক্ষসরাজ রাবণ বললেন, "ভয়ে আমি আমার বলবান ভাই কুম্ভকর্ণকে অকালে ঘুম থেকে জাগিয়েছিলাম। কিন্তু আজ তার বিশাল দেহ বজ্রাঘাতে পাহাড়ের চূড়া বা গাছের মতো সমুদ্রের তীরে পড়ে আছে। তবুও তোমার যদি একান্তই যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে, তবে তার আগে তুমি ইষ্টদেবতার পূজা করো এবং নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সম্পন্ন করো।" (এই যজ্ঞ করলে মেঘনাদ অমর হবেন)।
সেনাপতি পদে আমি বরিণু তোমারে।
দেখ, অস্তাচলগামী দিননাথ এবে;
প্রভাতে যুঝিও, বৎস, রাঘবের সাথে।"
এতেক কহিয়া রাজা, যথাবিধি লয়ে
গঙ্গোদক, অভিষেক করিলা কুমারে।
ব্যাখ্যা: রাবণ বললেন, "আমি তোমাকে সেনাপতি পদে বরণ করলাম। সূর্য (দিননাথ) এখন অস্ত যাচ্ছে, তাই আজ নয়, কাল সকালে তুমি রামের সাথে যুদ্ধ করো।" এই কথা বলে রাজা রাবণ নিয়ম মেনে গঙ্গাজল (গঙ্গোদক) দিয়ে পুত্র মেঘনাদকে সেনাপতি পদে অভিষেক করলেন।

৪. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ৫০+ টি প্রশ্ন

১. 'অভিষেক' কবিতাটি কার লেখা?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) কাজী নজরুল ইসলাম (গ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত (ঘ) সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
উত্তর: (গ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত
২. 'অভিষেক' কবিতাটি কোন কাব্যের অন্তর্গত?
(ক) বীরাঙ্গনা কাব্য (খ) তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (গ) ব্রজাঙ্গনা কাব্য (ঘ) মেঘনাদবধ কাব্য
উত্তর: (ঘ) মেঘনাদবধ কাব্য
৩. 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর কোন সর্গ থেকে কবিতাটি গৃহীত?
(ক) প্রথম সর্গ (খ) দ্বিতীয় সর্গ (গ) নবম সর্গ (ঘ) ষষ্ঠ সর্গ
উত্তর: (ক) প্রথম সর্গ (অভিষেক)
৪. 'বীরেন্দ্রকেশরী' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
(ক) রাবণকে (খ) রামচন্দ্রকে (গ) ইন্দ্রজিৎকে (ঘ) বীরবাহুকে
উত্তর: (গ) ইন্দ্রজিৎকে
৫. ইন্দ্রজিৎ কার চরণে প্রণাম করলেন?
(ক) রাবণের (খ) ধাত্রীর (গ) প্রমীলার (ঘ) শিবের
উত্তর: (খ) ধাত্রীর
৬. ইন্দ্রজিতের ধাত্রীমার নাম কী ছিল?
(ক) মন্দোদরী (খ) সরমা (গ) প্রভাষা (ঘ) ত্রিজটা
উত্তর: (গ) প্রভাষা
৭. ধাত্রীর ছদ্মবেশে কে এসেছিলেন?
(ক) দেবী সরস্বতী (খ) দেবী লক্ষ্মী (গ) দেবী দুর্গা (ঘ) দেবী চণ্ডী
উত্তর: (খ) দেবী লক্ষ্মী
৮. 'অম্বুরাশি-সুতা' শব্দের অর্থ কী?
(ক) মেঘের কন্যা (খ) সমুদ্রের কন্যা (গ) নদীর কন্যা (ঘ) পর্বতের কন্যা
উত্তর: (খ) সমুদ্রের কন্যা (লক্ষ্মী)
৯. ঘোরতর রণে কে নিহত হয়েছেন?
(ক) কুম্ভকর্ণ (খ) মেঘনাদ (গ) বীরবাহু (ঘ) অতিকায়
উত্তর: (গ) বীরবাহু
১০. বীরবাহু কে ছিলেন?
(ক) রাবণের ভাই (খ) ইন্দ্রজিতের ভাই (গ) রামের ভাই (ঘ) লক্ষ্মণের বন্ধু
উত্তর: (খ) ইন্দ্রজিতের ভাই
১১. রাক্ষসাধিপতি রাবণ নিজে কীসের জন্য সাজছিলেন?
(ক) যজ্ঞের জন্য (খ) শিকারের জন্য (গ) যুদ্ধ করার জন্য (ঘ) পূজার জন্য
উত্তর: (গ) যুদ্ধ করার জন্য
১২. মেঘনাদ কোথায় রামচন্দ্রকে সংহার করেছিলেন?
(ক) দিবা-রণে (খ) নিশা-রণে (গ) ভোরবেলা (ঘ) সন্ধ্যায়
উত্তর: (খ) নিশা-রণে
১৩. 'মায়াবী মানব' কে?
(ক) লক্ষ্মণ (খ) রাবণ (গ) সীতাপতি রাম (ঘ) বিভীষণ
উত্তর: (গ) সীতাপতি রাম
১৪. 'রত্নাকর রত্নোত্তমা' কাকে বলা হয়েছে?
(ক) প্রভাষাকে (খ) ইন্দিরা সুন্দরীকে (লক্ষ্মী) (গ) প্রমীলাকে (ঘ) সীতাকে
উত্তর: (খ) ইন্দিরা সুন্দরীকে (লক্ষ্মী)
১৫. রামচন্দ্রের পুনর্জীবনের কথা শুনে ইন্দ্রজিৎ রাগে কী ছিঁড়লেন?
(ক) বস্ত্র (খ) কুসুমদাম (ফুলের মালা) (গ) রথ (ঘ) ধনুক
উত্তর: (খ) কুসুমদাম (ফুলের মালা)
১৬. কুণ্ডল কোথায় পড়ে ছিল?
(ক) বিছানায় (খ) পদতলে (গ) রথে (ঘ) সিংহাসনে
উত্তর: (খ) পদতলে
১৭. পদতলে পড়ে থাকা কুণ্ডলকে কীসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
(ক) অশোকের তলে থাকা অশোক ফুলের (খ) চাঁদের (গ) তারার (ঘ) পদ্মের
উত্তর: (ক) অশোকের তলে থাকা অশোক ফুলের
১৮. ইন্দ্রজিৎ কোথায় ছিলেন যখন লঙ্কায় শত্রু প্রবেশ করে?
(ক) যুদ্ধে (খ) বামাদল মাঝে (নারীদের মাঝে) (গ) যজ্ঞে (ঘ) স্বর্গে
উত্তর: (খ) বামাদল মাঝে (নারীদের মাঝে)
১৯. 'দশাননাত্মজ' শব্দের অর্থ কী?
(ক) দশ মাথা (খ) দশানন বা রাবণের পুত্র (গ) দশ দিক (ঘ) দশ হাত
উত্তর: (খ) দশানন বা রাবণের পুত্র
২০. 'রথীন্দ্রর্ষভ' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
(ক) রাবণ (খ) রাম (গ) ইন্দ্রজিৎ (ঘ) কার্তিকেয়
উত্তর: (গ) ইন্দ্রজিৎ
২১. 'হৈমবতীসুত' কে?
(ক) গণেশ (খ) কার্তিকেয় (গ) মেঘনাদ (ঘ) অর্জুন
উত্তর: (খ) কার্তিকেয়
২২. কার্তিকেয় কাকে নাশ করেছিলেন?
(ক) মহিষাসুর (খ) তারকাসুর (গ) রক্তবীজ (ঘ) শুম্ভ
উত্তর: (খ) তারকাসুর
২৩. 'কিরীটী' কার নাম?
(ক) ভীম (খ) যুধিষ্ঠির (গ) অর্জুন (ঘ) নকুল
উত্তর: (গ) অর্জুন
২৪. অর্জুন কোথায় গোধন উদ্ধার করতে সেজেছিলেন?
(ক) কুরুক্ষেত্রে (খ) শমীবৃক্ষমূলে (গ) বিরাট নগরে (ঘ) পাঞ্চালে
উত্তর: (খ) শমীবৃক্ষমূলে
২৫. ইন্দ্রজিতের রথের রং কেমন ছিল?
(ক) সোনার (খ) লাল (গ) মেঘবর্ণ (ঘ) সাদা
উত্তর: (গ) মেঘবর্ণ
২৬. রথের চাকায় কীসের ছটা ছিল?
(ক) আগুনের (খ) বিজলীর (বিদ্যুতের) (গ) মণির (ঘ) সোনার
উত্তর: (খ) বিজলীর (বিদ্যুতের)
২৭. রথের পতাকা কেমন ছিল?
(ক) কালো (খ) ইন্দ্রচাপরূপী (রামধনু) (গ) নীল (ঘ) লাল
উত্তর: (খ) ইন্দ্রচাপরূপী (রামধনু)
২৮. রথের ঘোড়াগুলো কেমন ছিল?
(ক) ধীরগতি (খ) আশুগতি (বাতাসের মতো দ্রুত) (গ) দুর্বল (ঘ) বিশাল
উত্তর: (খ) আশুগতি (বাতাসের মতো দ্রুত)
২৯. ইন্দ্রজিতের স্ত্রীর নাম কী?
(ক) সীতা (খ) মন্দোদরী (গ) প্রমীলা (ঘ) সুলোচনা
উত্তর: (গ) প্রমীলা
৩০. প্রমীলা মেঘনাদকে কীভাবে ধরেছিলেন?
(ক) হেমলতা যেমন তরুকে জড়িয়ে ধরে (খ) সাপ যেমন গাছকে ধরে (গ) নদীর মতো (ঘ) ছায়ার মতো
উত্তর: (ক) হেমলতা যেমন তরুকে জড়িয়ে ধরে
৩১. হাতি চলে গেলেও সে লতাকে কোথায় আশ্রয় দেয়?
(ক) শুঁড়ে (খ) পিঠে (গ) পদাশ্রয়ে (ঘ) দাঁতে
উত্তর: (গ) পদাশ্রয়ে
৩২. প্রমীলা মেঘনাদকে কোন জয়ে জয়ী বলেছেন?
(ক) যুদ্ধে (খ) ইন্দ্রজিতে জিতি (প্রেমের জয়ে) (গ) স্বর্গ জয়ে (ঘ) পৃথিবী জয়ে
উত্তর: (খ) ইন্দ্রজিতে জিতি (প্রেমের জয়ে)
৩৩. 'বিধুমুখি' শব্দের অর্থ কী?
(ক) চাঁদমুখো (খ) সূর্যমুখো (গ) পদ্মমুখো (ঘ) মিষ্টি মুখ
উত্তর: (ক) চাঁদমুখো
৩৪. মেঘনাদের রথ ওড়ার সময় কার মতো লাগছিল?
(ক) পাখির মতো (খ) মৈনাক-শৈল বা পর্বতের মতো (গ) মেঘের মতো (ঘ) ধূমকেতুর মতো
উত্তর: (খ) মৈনাক-শৈল বা পর্বতের মতো
৩৫. মেঘনাদ যখন ধনুকের ছিলা টানলেন, তখন কার মতো শব্দ হয়েছিল?
(ক) সিংহের মতো (খ) মেঘের মাঝে গরুড়ের (পক্ষীন্দ্র) মতো (গ) সাপের মতো (ঘ) হাতির মতো
উত্তর: (খ) মেঘের মাঝে গরুড়ের (পক্ষীন্দ্র) মতো
৩৬. 'শিঞ্জিনী' শব্দের অর্থ কী?
(ক) তলোয়ার (খ) ধনুকের ছিলা বা গুণ (গ) বাণ (ঘ) বর্ম
উত্তর: (খ) ধনুকের ছিলা বা গুণ
৩৭. লঙ্কায় কোন বাদ্য বাজছিল?
(ক) বিয়ের বাদ্য (খ) রণ-বাজনা (গ) ঢাক (ঘ) শাঁখ
উত্তর: (খ) রণ-বাজনা
৩৮. লঙ্কার আকাশে কী উড়ছিল?
(ক) কৌশিক-ধ্বজ (রেশমি পতাকা) (খ) কাক (গ) ধুলো (ঘ) মেঘ
উত্তর: (ক) কৌশিক-ধ্বজ (রেশমি পতাকা)
৩৯. রাক্ষস সৈন্যরা মেঘনাদকে দেখে কী করল?
(ক) কাঁদল (খ) পালিয়ে গেল (গ) মহাগর্বে গর্জন করল (নাদিলা) (ঘ) প্রণাম করল
উত্তর: (গ) মহাগর্বে গর্জন করল (নাদিলা)
৪০. মেঘনাদ রামচন্দ্রকে কী দিয়ে ভস্ম করতে চেয়েছিলেন?
(ক) আগুনে (খ) শরানলে (বাণের আগুনে) (গ) জাদুতে (ঘ) অভিশাপে
উত্তর: (খ) শরানলে (বাণের আগুনে)
৪১. মেঘনাদ রামকে কী দিয়ে উড়াতে চেয়েছিলেন?
(ক) বায়ু-অস্ত্রে (খ) ঝড়ে (গ) মন্ত্রে (ঘ) আগুনে
উত্তর: (ক) বায়ু-অস্ত্রে
৪২. রাবণ মেঘনাদকে বারবার কোথায় পাঠাতে চাইছিলেন না?
(ক) বনে (খ) কাল সমরে (যুদ্ধে) (গ) স্বর্গে (ঘ) পাতালে
উত্তর: (খ) কাল সমরে (যুদ্ধে)
৪৩. "হায়, বিধি বাম মম প্রতি।" - 'বাম' শব্দের অর্থ কী?
(ক) ডান (খ) বিরূপ বা প্রতিকূল (গ) প্রসন্ন (ঘ) নিচে
উত্তর: (খ) বিরূপ বা প্রতিকূল
৪৪. রাবণ মেঘনাদকে কী অসাধ্য কাজের কথা বলেছিলেন?
(ক) জলে শিলা ভাসা এবং মৃতের পুনর্জীবন (খ) আকাশে ওড়া (গ) আগুন খাওয়া (ঘ) সমুদ্র শোকানো
উত্তর: (ক) জলে শিলা ভাসা এবং মৃতের পুনর্জীবন
৪৫. রাবণ মেঘনাদ জীবিত থাকতে নিজে যুদ্ধে গেলে কারা হাসবেন?
(ক) মানুষ (খ) রাক্ষসরা (গ) মেঘবাহন (ইন্দ্র) ও দেবতারা (ঘ) রাম-লক্ষ্মণ
উত্তর: (গ) মেঘবাহন (ইন্দ্র) ও দেবতারা
৪৬. মেঘনাদ কতবার রামকে হারিয়েছিলেন?
(ক) একবার (খ) দুই বার (গ) তিন বার (ঘ) চার বার
উত্তর: (খ) দুই বার
৪৭. রাবণ কাকে অকালে জাগিয়েছিলেন?
(ক) মেঘনাদকে (খ) কুম্ভকর্ণকে (গ) বিভীষণকে (ঘ) বীরবাহুকে
উত্তর: (খ) কুম্ভকর্ণকে
৪৮. কুম্ভকর্ণের মৃতদেহ সমুদ্রতীরে কীভাবে পড়েছিল?
(ক) পাখির মতো (খ) বজ্রাঘাতে গিরিশৃঙ্গ বা গাছের মতো (গ) পাথরের মতো (ঘ) সাপের মতো
উত্তর: (খ) বজ্রাঘাতে গিরিশৃঙ্গ বা গাছের মতো
৪৯. রাবণ মেঘনাদকে যুদ্ধে যাওয়ার আগে কী করতে বলেছিলেন?
(ক) খেতে (খ) ঘুমাতে (গ) নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করতে (ঘ) সৈন্য গোছাতে
উত্তর: (গ) নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করতে
৫০. রাবণ মেঘনাদকে কী দিয়ে সেনাপতি পদে অভিষেক করলেন?
(ক) চন্দন দিয়ে (খ) দুধ দিয়ে (গ) গঙ্গোদক (গঙ্গাজল) দিয়ে (ঘ) রক্ত দিয়ে
উত্তর: (গ) গঙ্গোদক (গঙ্গাজল) দিয়ে

৫. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ৪০+ টি প্রশ্ন

১. 'অভিষেক' কবিতাটি কোন মহাকাব্যের অংশ এবং এর রচয়িতা কে?
উত্তর: 'অভিষেক' কবিতাটি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গ থেকে গৃহীত।
২. ইন্দ্রজিৎ ধাত্রীমাতাকে কী জিজ্ঞাসা করেছিলেন?
উত্তর: প্রমোদকাননে ধাত্রীমাতাকে আসতে দেখে ইন্দ্রজিৎ জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে সেখানে তাঁর আসার কারণ কী এবং লঙ্কার খবর কেমন।
৩. ছদ্মবেশী ধাত্রীমাতা লঙ্কার কোন দুঃসংবাদ দিয়েছিলেন?
উত্তর: ধাত্রীরূপী দেবী লক্ষ্মী দুঃসংবাদ দেন যে, ঘোর যুদ্ধে রামচন্দ্রের হাতে ইন্দ্রজিতের ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছেন এবং রাজা রাবণ নিজেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
৪. বীরবাহুর মৃত্যুর খবরে ইন্দ্রজিৎ কেন বিস্মিত হয়েছিলেন?
উত্তর: ইন্দ্রজিৎ নিজে নিশা-যুদ্ধে রামচন্দ্রকে খণ্ড খণ্ড করে কেটে হত্যা করেছিলেন, তাই সেই মৃত রামচন্দ্রের হাতে ভাই বীরবাহুর মৃত্যুর খবর তাঁর কাছে অসম্ভব ও বিস্ময়কর মনে হয়েছিল।
৫. 'মায়াবী মানব' বলতে কাকে এবং কেন বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'মায়াবী মানব' বলতে সীতাপতি রামচন্দ্রকে বোঝানো হয়েছে, কারণ তিনি ইন্দ্রজিতের বাণে মরে গিয়েও মায়াবলে পুনরায় বেঁচে উঠেছিলেন।
৬. রামের পুনর্জীবনের কথা শুনে রাগে মেঘনাদ কী করেছিলেন?
উত্তর: রামের পুনর্জীবনের কথা শুনে রাগে মেঘনাদ তাঁর গলার ফুলের মালা ছিঁড়ে ফেলেন এবং হাতের সোনার বালা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেন।
৭. ইন্দ্রজিৎ নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলেন কেন?
উত্তর: শত্রুরা যখন স্বর্ণলঙ্কা ঘিরে ফেলেছে এবং রাক্ষসকুল বিপদে, তখন তিনি নিজে নারীদের মাঝে প্রমোদকাননে বিলাসে মগ্ন ছিলেন বলে লজ্জিত হয়ে ইন্দ্রজিৎ নিজেকে ধিক্কার দেন।
৮. যুদ্ধে যাওয়ার জন্য ইন্দ্রজিৎ কীভাবে সেজেছিলেন?
উত্তর: তারকাসুর বধের সময় কার্তিকেয় বা গোধন উদ্ধারের সময় বৃহন্নলারূপী অর্জুন যেভাবে সেজেছিলেন, ঠিক তেমনই বীরের সাজে ইন্দ্রজিৎ সেজেছিলেন।
৯. ইন্দ্রজিতের রথের বর্ণনা দাও।
উত্তর: ইন্দ্রজিতের রথ ছিল মেঘের মতো কালো, চাকায় ছিল বিদ্যুতের ছটা, পতাকা রামধনুর মতো রঙিন এবং ঘোড়াগুলো ছিল বাতাসের মতো দ্রুতগামী।
১০. মেঘনাদের যাত্রাকালে প্রমীলা কী করেছিলেন?
উত্তর: মেঘনাদের যাত্রাকালে তাঁর স্ত্রী প্রমীলা এসে তাঁর দুই হাত ধরে ফেলেন এবং তাঁকে ফেলে রেখে না যাওয়ার জন্য আকুল আবেদন করেন।
১১. প্রমীলা নিজেকে কীসের সঙ্গে এবং মেঘনাদকে কীসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
উত্তর: প্রমীলা নিজেকে বনলতার (ব্রততী) সঙ্গে এবং মেঘনাদকে বনের বৃক্ষ বা হাতির (তরু-কুলেশ্বর বা মাতঙ্গ) সঙ্গে তুলনা করেছেন।
১২. প্রমীলার আকুলতায় মেঘনাদ কী উত্তর দিয়েছিলেন?
উত্তর: মেঘনাদ হেসে বলেছিলেন যে প্রমীলা তাঁকে প্রেমের দৃঢ় বাঁধনে বেঁধেছেন, তাই তিনি রামকে বধ করে প্রমীলার কল্যাণে খুব দ্রুত ফিরে আসবেন।
১৩. মেঘনাদের রথ কীভাবে উড়েছিল?
উত্তর: মেঘনাদের রথ ভয়ংকর শব্দ করে আকাশের পথে উড়েছিল, যেন সোনার ডানা মেলে মৈনাক পর্বত আকাশ উজ্জ্বল করে উড়ছে।
১৪. মেঘনাদের ধনুকের টঙ্কার কেমন ছিল?
উত্তর: মেঘনাদের ধনুকের ছিলা টানার ভয়ংকর শব্দ ছিল মেঘের মাঝে গরুড়ের (পক্ষীন্দ্র) গর্জনের মতো, যাতে লঙ্কা ও সমুদ্র কেঁপে উঠেছিল।
১৫. রাবণ যখন যুদ্ধের সাজে সাজছিলেন, তখন লঙ্কার পরিবেশ কেমন ছিল?
উত্তর: রাবণ সাজলে লঙ্কায় রণবাদ্য বেজে ওঠে, হাতি গর্জন করে, ঘোড়া ডাকে, পদাতিক ও রথীরা হুংকার দেয় এবং আকাশে রেশমি পতাকা ও সোনার বর্মের আলো ছড়ায়।
১৬. মেঘনাদকে দেখে রাক্ষস সৈন্যরা কী করেছিল?
উত্তর: বীর মেঘনাদকে দেখে লঙ্কার রাক্ষস সৈন্যরা বা নৈর্ঋতদল আনন্দে ও মহাগর্বে গর্জন করে উঠেছিল।
১৭. মেঘনাদ পিতার কাছে কী অনুমতি চেয়েছিলেন?
উত্তর: মেঘনাদ পিতার কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন যেন তিনি যুদ্ধে গিয়ে রামচন্দ্রকে সমূলে নির্মূল করতে পারেন।
১৮. রামকে কীভাবে মারবেন বলে মেঘনাদ রাবণকে জানান?
উত্তর: মেঘনাদ জানান যে তিনি রামকে বাণের আগুনে ভস্ম করে বায়ু অস্ত্রে উড়িয়ে দেবেন অথবা বেঁধে এনে পিতার পায়ে সমর্পণ করবেন।
১৯. মেঘনাদের কথা শুনে রাবণ কী উত্তর দিয়েছিলেন?
উত্তর: রাবণ মেঘনাদকে রাক্ষসকুলের একমাত্র ভরসা বলে উল্লেখ করে বলেন যে এই কালসমরে তিনি বারবার পুত্রকে পাঠাতে চান না।
২০. "বিধি বাম মম প্রতি" - কথাটির অর্থ কী এবং রাবণ কেন এ কথা বলেছিলেন?
উত্তর: কথাটির অর্থ ভাগ্য বিরূপ। জলে পাথর ভাসা এবং রামের মরে গিয়ে বেঁচে ওঠার মতো অসম্ভব ঘটনা ঘটতে দেখে রাবণের মনে হয়েছিল ভাগ্য তাঁর বিরুদ্ধে।
২১. মেঘনাদ জীবিত থাকতে রাবণ যুদ্ধে গেলে কী কলঙ্ক রটবে বলে মেঘনাদ জানান?
উত্তর: মেঘনাদ জানান যে তিনি নিজে জীবিত থাকতে পিতা রাবণ যদি যুদ্ধে যান, তবে জগতে কলঙ্ক রটবে এবং ইন্দ্র ও দেবতারা হাসাহাসি করবেন।
২২. মেঘনাদ রামকে কতবার হারিয়েছিলেন?
উত্তর: মেঘনাদ রামকে এর আগে দুই বার যুদ্ধে হারিয়েছিলেন।
২৩. রাবণ কুম্ভকর্ণকে অকালে কেন জাগিয়েছিলেন?
উত্তর: রাম-লক্ষ্মণের সাথে ঘোর যুদ্ধে লঙ্কার বিপদের আশঙ্কায় রাবণ ভয়ে তাঁর বলবান ভাই কুম্ভকর্ণকে অকালে ঘুম থেকে জাগিয়েছিলেন।
২৪. কুম্ভকর্ণের মৃতদেহের অবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: কুম্ভকর্ণের বিশাল মৃতদেহ সমুদ্রের তীরে এমনভাবে পড়ে ছিল যেন বজ্রাঘাতে কোনো পাহাড়ের চূড়া বা বড়ো গাছ মাটিতে পড়ে আছে।
২৫. রাবণ মেঘনাদকে যুদ্ধের আগে কী করতে বলেছিলেন?
উত্তর: রাবণ মেঘনাদকে যুদ্ধের আগে ইষ্টদেবতার পূজা করতে এবং 'নিকুম্ভিলা যজ্ঞ' সম্পন্ন করতে বলেছিলেন।
২৬. রাবণ কবে মেঘনাদকে যুদ্ধ করতে যেতে বলেন?
উত্তর: সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছিল বলে রাবণ মেঘনাদকে পরের দিন সকালে (প্রভাতে) রামের সাথে যুদ্ধ করতে যেতে বলেন।
২৭. রাবণ কীভাবে মেঘনাদের অভিষেক করেছিলেন?
উত্তর: রাবণ গঙ্গাজল বা গঙ্গোদক দিয়ে শাস্ত্রীয় নিয়মানুসারে পুত্র মেঘনাদকে সেনাপতি পদে অভিষেক করেছিলেন।
২৮. 'অম্বুরাশি-সুতা' কে এবং তিনি কেন এসেছিলেন?
উত্তর: 'অম্বুরাশি-সুতা' হলেন দেবী লক্ষ্মী। তিনি ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে লঙ্কার বীরবাহুর মৃত্যুর খবর মেঘনাদকে দিতে এসেছিলেন।
২৯. 'দশাননাত্মজ' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'দশানন' অর্থাৎ রাবণের 'আত্মজ' বা পুত্র হলেন মেঘনাদ। তাই মেঘনাদকে দশাননাত্মজ বলা হয়েছে।
৩০. 'রথীন্দ্রর্ষভ' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: রথীদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ বা ঋষভ (ষাঁড়/শ্রেষ্ঠ), তাঁকে রথীন্দ্রর্ষভ বলা হয়। কবিতায় এটি বীর ইন্দ্রজিতের বিশেষণ।
৩১. কার্তিকেয় কাকে বিনাশ করেছিলেন?
উত্তর: শিব ও পার্বতীর পুত্র কার্তিকেয় মহাসুর তারকাসুরকে বিনাশ করেছিলেন।
৩২. বৃহন্নলারূপী কিরীটী কে ছিলেন?
উত্তর: অজ্ঞাতবাসের সময় মহাভারতের তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন নারীবেশ ধারণ করে 'বৃহন্নলা' নাম নিয়েছিলেন। কিরীটী হলো অর্জুনেরই আরেক নাম।
৩৩. 'ইন্দ্রচাপরূপী' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: 'ইন্দ্রচাপ' মানে রামধনু। মেঘনাদের রথের পতাকাটি রামধনুর মতো রঙিন ও সুন্দর ছিল বোঝাতেই ইন্দ্রচাপরূপী বলা হয়েছে।
৩৪. প্রমীলা নিজেকে 'কিঙ্করী' বলেছেন কেন?
উত্তর: 'কিঙ্করী' শব্দের অর্থ দাসী। স্বামীর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ও ভালোবাসার কারণেই প্রমীলা নিজেকে মেঘনাদের দাসী বলে উল্লেখ করেছেন।
৩৫. 'মৈনাক-শৈল' কী?
উত্তর: পৌরাণিক কাহিনি মতে মৈনাক হলো হিমালয় পর্বতের পুত্র। তার সোনার ডানা ছিল এবং সে আকাশে উড়তে পারত।
৩৬. 'শিঞ্জিনী আকর্ষি রোষে' - এর অর্থ কী?
উত্তর: এর অর্থ হলো মেঘনাদ প্রচণ্ড রাগে ধনুকের ছিলা বা গুণ (শিঞ্জিনী) প্রবল শক্তিতে আকর্ষণ করেছিলেন বা টেনেছিলেন।
৩৭. 'পক্ষীন্দ্র' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'পক্ষীন্দ্র' বলতে পাখিদের রাজা গরুড়কে বোঝানো হয়েছে, যার ডাকের সঙ্গে মেঘনাদের ধনুকের টঙ্কারের তুলনা করা হয়েছে।
৩৮. 'কৌশিক-ধ্বজ' কী?
উত্তর: 'কৌশিক-ধ্বজ' হলো রেশমি কাপড়ের তৈরি পতাকা, যা রাবণের লঙ্কায় যুদ্ধের প্রস্তুতিকালে আকাশে উড়ছিল।
৩৯. 'মেঘবাহন' কে?
উত্তর: 'মেঘবাহন' হলেন দেবরাজ ইন্দ্র, কারণ তিনি মেঘকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন। ইন্দ্রজিৎ তাঁকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন।
৪০. 'নিকুম্ভিলা যজ্ঞ' কী?
উত্তর: 'নিকুম্ভিলা যজ্ঞ' হলো রাক্ষসদের ইষ্টদেবতা অগ্নিদেবের উদ্দেশ্যে করা একটি বিশেষ যজ্ঞ, যা সম্পন্ন করলে মেঘনাদ যুদ্ধে অপরাজিত থাকবেন।

৬. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ১০ টি প্রশ্ন

১. 'অভিষেক' কবিতায় ইন্দ্রজিৎ চরিত্রটির বীরত্ব ও দেশপ্রেমের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা আলোচনা করো।

উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কবিতায় মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ কেবল একজন বীর যোদ্ধাই নন, তিনি একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকও বটে।

যখন তিনি প্রমোদকাননে বিলাসে মগ্ন ছিলেন, তখন ধাত্রীরূপী দেবী লক্ষ্মীর কাছ থেকে লঙ্কার বিপদের খবর পেয়ে তিনি গভীর অনুশোচনায় দগ্ধ হন। তিনি নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বলেন যে, স্বর্ণলঙ্কা যখন শত্রুর দ্বারা বেষ্টিত, তখন তাঁর মতো বীরের পক্ষে নারীদের মাঝে সময় কাটানো চরম অপমানের। এই আত্মধিক্কার তাঁর গভীর দেশপ্রেমেরই প্রমাণ।
বীরত্বের দিক থেকে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। রামচন্দ্রকে তিনি ইতিপূর্বেই দুবার পরাজিত ও নিহত করেছিলেন। রামের পুনর্জীবনের কথা শুনে তিনি একটুও ভয় পাননি, বরং ক্ষোভে ফেটে পড়ে রামকে সমূলে নির্মূল করার শপথ নেন। পিতা রাবণ যখন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখন মেঘনাদ তাঁকে বাধা দিয়ে বলেন যে পুত্র জীবিত থাকতে পিতা যুদ্ধে গেলে তা তাঁর বীরত্বের পক্ষে চরম কলঙ্ক। স্ত্রী প্রমীলার বিদায়বেদনা তাঁকে স্পর্শ করলেও কর্তব্যের টানে তিনি অবিচল থাকেন। তাঁর রথে ওঠার ভঙ্গি এবং ধনুকের টঙ্কারে শত্রুপক্ষের বুকে কাঁপন ধরে যায়। এই অকুতোভয় মানসিকতা এবং দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবল ইচ্ছাই তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ বীর ও দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

২. "ধিক্ মোরে" - কে, কেন নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন? এই ধিক্কারের পরিণতি কী হয়েছিল?

উত্তর: বক্তা: উদ্ধৃত কথাটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কবিতার অন্যতম প্রধান চরিত্র রাবণ-পুত্র বীর ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদ বলেছেন।

ধিক্কারের কারণ: ইন্দ্রজিৎ প্রমোদকাননে নারীদের সাথে বিলাসব্যসনে সময় কাটাচ্ছিলেন। এমন সময় ধাত্রীমাতা প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মী সেখানে এসে তাঁকে জানান যে রামচন্দ্রের সাথে যুদ্ধে তাঁর ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছেন এবং লঙ্কার চরম বিপদের কারণে স্বয়ং পিতা রাবণ যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হচ্ছেন। এই খবর শুনে ইন্দ্রজিৎ স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেন যে লঙ্কা যখন শত্রুর দ্বারা অবরুদ্ধ এবং তাঁর পিতা যখন শোকাতুর হয়েও যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁর মতো বীরের পক্ষে প্রমোদকাননে নারীদের মাঝে থাকা চরম লজ্জার বিষয়। এই কর্তব্যে অবহেলা এবং বীরত্বের অবমাননার জন্যই তিনি নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলেন।

পরিণতি: এই আত্মধিক্কারের পর ইন্দ্রজিৎ কালক্ষেপ না করে দ্রুত যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হন। তিনি তাঁর গলার ফুলের মালা ছিঁড়ে ফেলেন এবং রথে চড়ে বীরদর্পে লঙ্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন, যাতে রামচন্দ্রকে হত্যা করে তিনি নিজের এই অপবাদ ঘোচাতে পারেন।

৩. 'অভিষেক' কবিতা অবলম্বনে মেঘনাদ ও প্রমীলার বিদায় দৃশ্যের বর্ণনা দাও।

উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কবিতায় বীররসের পাশাপাশি মেঘনাদ ও তাঁর স্ত্রী প্রমীলার বিদায় দৃশ্যে এক অদ্ভুত করুণ রস ও দাম্পত্য প্রেমের চিত্র ফুটে উঠেছে।

লঙ্কার চরম বিপদের খবর পেয়ে মেঘনাদ যখন যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে রথে আরোহণ করছেন, ঠিক তখনই তাঁর স্ত্রী প্রমীলা এসে তাঁর দুই হাত জড়িয়ে ধরেন। বনলতা যেমন বনস্পতিকে জড়িয়ে ধরে, ঠিক তেমনিভাবে প্রমীলা তাঁর স্বামীকে আঁকড়ে ধরে কেঁদে ওঠেন। তিনি মেঘনাদকে জিজ্ঞাসা করেন, তাঁকে একা ফেলে মেঘনাদ কোথায় চলেছেন। প্রমীলা হাতির উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, বনের লতা হাতির পা জড়ালে হাতি যদিও তার দিকে মন না দিয়ে চলে যায়, তবুও লতাটি হাতির পায়ে আশ্রয় পায়। কিন্তু মেঘনাদ কেন তাঁকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন? স্বামীর বিরহে তিনি যে প্রাণ ধারণ করতে পারবেন না, তা তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
স্ত্রীর এই আকুলতায় মেঘনাদ হেসে উত্তর দেন যে, প্রমীলা তাঁকে প্রেমের যে দৃঢ় বাঁধনে বেঁধেছেন, তা ছিন্ন করার সাধ্য কারো নেই। তিনি রামচন্দ্রকে বধ করে প্রমীলার কল্যাণে খুব দ্রুত ফিরে আসবেন বলে আশ্বাস দেন এবং বিদায় প্রার্থনা করেন। এই দৃশ্যটি একাধারে মেঘনাদের কোমল হৃদয় এবং কর্তব্যের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠার প্রমাণ দেয়।

৪. "হায়, বিধি বাম মম প্রতি।" - বক্তা কে? তিনি কেন এমন কথা বলেছেন?

উত্তর: বক্তা: উদ্ধৃত কথাটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কবিতায় লঙ্কার অধিপতি রাক্ষসরাজ রাবণ বলেছেন।

কারণ: 'বিধি বাম মম প্রতি' কথাটির অর্থ হলো ভাগ্য আমার প্রতি বিরূপ বা প্রতিকূল। রাবণ ছিলেন প্রবল পরাক্রমশালী রাজা। কিন্তু রামচন্দ্রের সাথে যুদ্ধে তিনি তাঁর বীর ভাই কুম্ভকর্ণ এবং প্রিয় পুত্র বীরবাহু সহ অনেক বীর যোদ্ধাকে হারিয়েছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইন্দ্রজিৎ রাতের যুদ্ধে রামচন্দ্রকে খণ্ড খণ্ড করে কেটে হত্যা করার পরেও, সেই রামচন্দ্র মায়াবলে পুনরায় বেঁচে উঠেছেন। শুধু তাই নয়, রামচন্দ্রের বানরসেনারা সাগরের জলে পাথর ভাসিয়ে সেতু নির্মাণ করেছে, যা সম্পূর্ণ অসম্ভব একটি ঘটনা।
যেখানে মৃত মানুষ বেঁচে ওঠে এবং পাথর জলে ভাসে, সেখানে স্বাভাবিক কোনো নিয়ম কাজ করে না। রাবণ বুঝতে পেরেছেন যে স্বয়ং দেবতারা এবং নিয়তি রামচন্দ্রের সহায় হয়েছেন, তাই অসম্ভবও সম্ভব হচ্ছে। এই কালসমরে নিজের একমাত্র ভরসা ইন্দ্রজিৎকে বারবার পাঠিয়ে তাঁকে আর হারাতে চান না রাবণ। নিয়তির এই নির্মম পরিহাস এবং অসহায়তার কারণেই রাবণ আক্ষেপ করে বলেছেন যে ভাগ্য আজ তাঁর প্রতি চরম বিরূপ।

৫. 'অভিষেক' কবিতায় ইন্দ্রজিতের যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতির যে বিবরণ আছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: 'অভিষেক' কবিতায় লঙ্কার বিপদ ও ভাই বীরবাহুর মৃত্যুর খবর পেয়ে ইন্দ্রজিৎ দ্রুত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। তাঁর এই যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত জমকালো এবং বীরত্বব্যঞ্জক।

রাগে নিজের অলংকার ছিঁড়ে ফেলে ইন্দ্রজিৎ রথীদের শ্রেষ্ঠ হিসেবে বীর-আভরণে সজ্জিত হন। কবি তাঁর সাজগোজকে দুটি পৌরাণিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন—তারকাসুর বধের উদ্দেশ্যে দেবসেনাপতি কার্তিকেয়র সাজ এবং বিরাট রাজার গোধন উদ্ধারের জন্য শমীবৃক্ষমূলে বৃহন্নলারূপী অর্জুনের সাজ।
ইন্দ্রজিতের রথটিও ছিল অতিকায় ও ভয়ংকর। রথের রং ছিল মেঘের মতো কালো, চাকায় বিদ্যুতের মতো ছটা, পতাকা রামধনুর মতো রঙিন এবং ঘোড়াগুলো ছিল বাতাসের মতো দ্রুতগামী। স্ত্রী প্রমীলার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি যখন রথে ওঠেন, তখন রথটি প্রবল শব্দে আকাশে উড়ে যায়। মনে হয় যেন সোনার ডানা মেলে মৈনাক পর্বত আকাশে উড়ছে। আকাশে উড়ে মেঘনাদ যখন রাগে ধনুকের ছিলা আকর্ষণ করেন, তখন মেঘের মাঝে গরুড়ের গর্জনের মতো যে ভয়ংকর শব্দ সৃষ্টি হয়, তাতে গোটা লঙ্কা ও সমুদ্র কেঁপে ওঠে। এই রাজকীয় ও ভয়ংকর প্রস্তুতিই মেঘনাদের অসীম বীরত্বের পরিচয় বহন করে।

৬. "ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে।" - বক্তা কে? 'অপবাদ' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? বক্তা কীভাবে তা ঘোচাতে চেয়েছেন?

উত্তর: বক্তা: আলোচ্য উক্তিটির বক্তা হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর চরিত্র ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদ।

অপবাদ: 'অপবাদ' বলতে এখানে কলঙ্ক বা বদনামকে বোঝানো হয়েছে। লঙ্কায় রামচন্দ্রের আক্রমণে ঘোর সংকট দেখা দিয়েছে। ইন্দ্রজিতের বীর ভাই বীরবাহু যুদ্ধে মারা গেছেন এবং স্বয়ং রাজা রাবণ পুত্রশোকে কাতর হয়েও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর ঠিক সেই সময়ে রাক্ষসকুলের শ্রেষ্ঠ বীর এবং রাবণের পুত্র ইন্দ্রজিৎ প্রমোদকাননে নারীদের মাঝে বিলাসব্যসনে মগ্ন ছিলেন। দেশের এই বিপদের দিনে একজন শ্রেষ্ঠ বীরের এমন নিশ্চিন্তে প্রমোদকাননে সময় কাটানোটাকেই ইন্দ্রজিৎ নিজের জীবনের সবচেয়ে বড়ো কলঙ্ক বা 'অপবাদ' বলে মনে করেছেন।

কীভাবে ঘোচাতে চেয়েছেন: এই অপবাদ বা কলঙ্ক ঘোচানোর জন্য ইন্দ্রজিৎ কালক্ষেপ না করে দ্রুত যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হন। তিনি দৃঢ় সংকল্প নেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে শত্রু রামচন্দ্র ও তার বানর সেনাকে (রিপুকুল) সমূলে নির্মূল করবেন। শত্রুদের বধ করে লঙ্কাকে বিপদমুক্ত করার মাধ্যমেই তিনি নিজের বীরত্বের প্রমাণ দিয়ে এই অপবাদ ঘোচাতে চেয়েছেন।

৭. 'অভিষেক' নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত বিষয়বস্তু, চরিত্র বা মূল ঘটনার ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের আলোচ্য কবিতাটির 'অভিষেক' নামকরণ সম্পূর্ণ সার্থক ও যুক্তিসংগত।

'অভিষেক' শব্দের অর্থ হলো কোনো বিশেষ পদে বরণ করার জন্য জল সিঞ্চন বা স্নান করানো। কবিতায় আমরা দেখি, লঙ্কার ঘোর বিপদের দিনে ইন্দ্রজিৎ প্রমোদকানন থেকে ফিরে পিতার কাছে রামচন্দ্রকে বধ করার অনুমতি চান। রাবণ প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও ইন্দ্রজিতের অদম্য জেদ ও বীরত্বের কাছে হার মানেন। তিনি বুঝতে পারেন লঙ্কাকে রক্ষা করার জন্য ইন্দ্রজিৎ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তাই তিনি ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধের আগে ইষ্টদেবতার পূজা ও 'নিকুম্ভিলা যজ্ঞ' সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। এরপর সূর্য অস্ত যাচ্ছে দেখে পরদিন সকালে যুদ্ধের নির্দেশ দিয়ে রাবণ নিয়ম অনুসারে গঙ্গাজল দিয়ে ইন্দ্রজিৎকে রাক্ষস বাহিনীর 'সেনাপতি পদে' অভিষেক বা বরণ করেন।
সমগ্র কবিতাটি ইন্দ্রজিতের এই সেনাপতি পদে অভিষেকের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে, তাই 'অভিষেক' নামকরণটি বিষয়বস্তুর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং সর্বতোভাবে সার্থক।

৮. "এ কলঙ্ক, পিতঃ, ঘুষিবে জগতে।" - কোন কলঙ্কের কথা বলা হয়েছে? বক্তা তা নিবারণের জন্য কী করতে চেয়েছেন?

উত্তর: কলঙ্ক: মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কবিতায় বীর ইন্দ্রজিৎ তাঁর পিতা রাবণকে উদ্দেশ্য করে এই কথা বলেছেন। এখানে 'কলঙ্ক' বলতে ইন্দ্রজিতের মতো শক্তিশালী ও অজেয় পুত্রের জীবিত থাকা অবস্থাতেও পিতা রাবণের যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। ইন্দ্রজিৎ মনে করেন, পুত্র থাকতে পিতার যুদ্ধে যাওয়া রাক্ষসকুলের বীরত্বের পক্ষে চরম অপমানজনক। এই খবর যদি জগতে ছড়িয়ে পড়ে, তবে দেবতারা হাসাহাসি করবেন এবং দেবরাজ ইন্দ্র (মেঘবাহন) রাক্ষসদের কাপুরুষ ভেবে উপহাস করবেন। এটিই হলো সেই কলঙ্ক।

নিবারণের উপায়: এই কলঙ্ক নিবারণের জন্য ইন্দ্রজিৎ পিতার কাছে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে তিনি এর আগে দুবার রামচন্দ্রকে পরাজিত করেছেন। এবারও তিনি রামকে বাণের আগুনে ভস্ম করে বায়ু অস্ত্রে উড়িয়ে দেবেন অথবা বেঁধে এনে পিতার পায়ে সমর্পণ করবেন। রামকে সমূলে নির্মূল করার মধ্য দিয়েই তিনি পিতার সম্মান রক্ষা করতে এবং এই কলঙ্ক নিবারণ করতে চেয়েছেন।

৯. 'অভিষেক' কবিতায় রাবণ চরিত্রের যে পরিচয় পাও তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: 'অভিষেক' কবিতায় লঙ্কার অধিপতি রাবণ একজন প্রবল পরাক্রমশালী রাজা হওয়ার পাশাপাশি একজন স্নেহশীল ও শোকাহত পিতার রূপেও ধরা দিয়েছেন।

কবিতার শুরুতেই আমরা দেখি, পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুতে রাবণ 'মহাশোকী' হয়ে উঠেছেন। কিন্তু রাজধর্ম পালনের জন্য তিনি সেই শোক চেপে রেখে নিজেই যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হচ্ছেন। যখন ইন্দ্রজিৎ এসে যুদ্ধের অনুমতি চান, তখন রাবণের পিতৃহৃদয় কেঁদে ওঠে। তিনি মেঘনাদকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করে বলেন যে, এই কালসমরে তিনি বারবার পুত্রকে পাঠাতে চান না। কুম্ভকর্ণ ও বীরবাহুর মৃত্যুর পর মেঘনাদই তাঁর একমাত্র ভরসা। রামচন্দ্রের পুনর্জীবন এবং জলে পাথর ভাসার মতো অলৌকিক ঘটনা দেখে রাবণ উপলব্ধি করেছেন যে নিয়তি তাঁর প্রতি বিরূপ। তা সত্ত্বেও, পুত্রের জেদের কাছে নতিস্বীকার করে তিনি রাজধর্ম পালন করেন এবং সেনাপতি পদে ইন্দ্রজিৎকে অভিষেক করেন। একাধারে শোকাহত পিতা এবং অন্যদিকে কর্তব্যপরায়ণ রাজা হিসেবে রাবণের চরিত্রটি কবিতায় এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে।

১০. "সাজিছে রাবণ রাজা, বীরমদে মাতি" - রাবণের যুদ্ধসাজের যে বিবরণ কবিতায় রয়েছে তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কবিতায় রামচন্দ্রের বানর সেনার হাতে পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর খবর পেয়ে রাজা রাবণ শোকে কাতর হয়েও বীরদর্পে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর এই যুদ্ধসাজের এক রাজকীয় ও কোলাহলপূর্ণ বর্ণনা কবি দিয়েছেন।

রাবণ যখন যুদ্ধের সাজে সাজছিলেন, তখন সমগ্র লঙ্কা যেন রণহুংকারে মেতে উঠেছিল। চারিদিকে ভয়ংকর রণ-বাজনা বাজতে শুরু করেছিল। যুদ্ধের হাতিরা গর্জন করছিল এবং ঘোড়াগুলো প্রবল শব্দে ডাকছিল। পদাতিক সৈন্য এবং রথীরা মিলে রণক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য প্রবল হুংকার দিচ্ছিল। লঙ্কার আকাশে উড়ছিল রেশমি পতাকা বা 'কৌশিক-ধ্বজ'। সৈন্যদের পরনে থাকা সোনার বর্ম বা 'কাঞ্চন-কণ্ডুক'-এর ছটা আকাশে প্রতিফলিত হয়ে এক অদ্ভুত আলোর সৃষ্টি করেছিল। রাবণের এই সাজগোজ লঙ্কার অপরাজেয় শক্তি এবং যুদ্ধের ভয়াবহ ডামাডোলকেই স্পষ্ট করে তোলে।

৭. ব্যাকরণ ও নির্মিতি (Grammar) সিলেবাস অনুযায়ী

কারক ও অকারক সম্পর্ক

  • কনক-আসন ত্যজি, বীরেন্দ্রকেশরী... - কর্ম কারকে 'শূন্য' বিভক্তি।
  • প্রণমিয়া, ধাত্রীর চরণে - অধিকরণ কারকে 'এ' বিভক্তি।
  • ছিঁড়িলা কুসুমদাম রোষে মহাবলী - করণ কারকে 'এ' বিভক্তি (রাগের দ্বারা)।
  • গঙ্গোদক, অভিষেক করিলা কুমারে - কর্ম কারকে 'শূন্য' বিভক্তি।
  • সাজিছে রাবণ রাজা, বীরমদে মাতি - কর্তৃকারকে 'শূন্য' বিভক্তি।

সমাস নির্ণয়

  • মেঘনাদ: মেঘের মতো নাদ যার (উপমিত বহুব্রীহি সমাস)।
  • দশাননাত্মজ: দশাননের আত্মজ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস) / দশ আনন যার (বহুব্রীহি - দশানন)।
  • রথীন্দ্রর্ষভ: রথীন্দ্রদের মধ্যে ঋষভ (সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস)।
  • বীরেন্দ্রকেশরী: বীরেন্দ্র কেশরীর ন্যায় (উপমিত কর্মধারয় সমাস)।
  • মহাশোকী: মহা শোক যার (বহুব্রীহি সমাস)।

বাক্য ও বাচ্য পরিবর্তন

  • বাক্য: আন রথ ত্বরা করি; ঘুচাব এ অপবাদ। (জটিল বাক্যে)
    উত্তর: যেহেতু আমি এই অপবাদ ঘুচাব, সেহেতু ত্বরা করে রথ আনো।
  • বাক্য: হাসি উত্তরিলা মেঘনাদ। (যৌগিক বাক্যে)
    উত্তর: মেঘনাদ হাসলেন এবং উত্তর দিলেন।
  • বাচ্য: কে কবে শুনেছে, পুত্র, ভাসে শিলা জলে। (কর্মবাচ্যে)
    উত্তর: কার দ্বারা কবে শোনা হয়েছে, পুত্র, জলে শিলা ভাসে।
  • বাচ্য: সাজিছে রাবণ রাজা। (ভাববাচ্যে)
    উত্তর: রাবণ রাজার সাজা হচ্ছে।

নির্মিতি (অনুশীলনের জন্য)

  • কাল্পনিক সংলাপ: যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে মেঘনাদ এবং প্রমীলার মধ্যে যে বিদায় দৃশ্যটি তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে একটি কাল্পনিক সংলাপ রচনা করো।
  • প্রতিবেদন রচনা: "লঙ্কায় আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং মেঘনাদের সেনাপতি পদে অভিষেক" - এই শিরোনামে সংবাদপত্রে প্রকাশের উপযোগী একটি প্রতিবেদন রচনা করো।

অভিষেক কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

কবিতাটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা এবং এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ অমর সৃষ্টি 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গ থেকে গৃহীত হয়েছে।

কবিতায় রাবণ-পুত্র বীর ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদের রাক্ষস বাহিনীর সেনাপতি পদে অভিষেকের কথা বলা হয়েছে।

লঙ্কা যখন শত্রুর দ্বারা বেষ্টিত এবং তাঁর ভাই বীরবাহু যখন যুদ্ধে মারা গেছেন, তখন তিনি নিজে প্রমোদকাননে নারীদের মাঝে বিলাসব্যসনে মগ্ন ছিলেন বলে লজ্জিত হয়ে নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলেন।

কুম্ভকর্ণ ও বীরবাহুর মৃত্যুর পর মেঘনাদই ছিল রাবণের একমাত্র ভরসা। রামচন্দ্রের পুনর্জীবন দেখে রাবণ বুঝেছিলেন নিয়তি তাঁদের বিরুদ্ধে, তাই তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে বারবার যুদ্ধে পাঠিয়ে হারাতে চাইছিলেন না।