Chapter 9: উত্তর আমেরিকা
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 40 MCQ | 30 SAQ | 10 Broad Questions
পঞ্চহ্রদ
সুপিরিয়র, মিশিগান, হুরণ, ইরি, অন্টারিও
গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন
কলোরাডো নদীর গভীর গিরিখাত
ডেট্রয়েট
বিশ্বের মোটরগাড়ি নির্মাণ রাজধানী
কাষ্ঠ ও কাগজ শিল্প
কানাডীয় শিল্ডের তৈগা বনভূমি
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
40 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
30 টি১৫০১ খ্রিস্টাব্দে আমেরিগো ভেসপুচি নামক এক পর্তুগিজ নাবিক কলম্বাসের পথ অনুসরণ করে এই মহাদেশের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছান। তিনি প্রমাণ করেন এটি ভারত নয়, বরং একটি নতুন মহাদেশ। তাঁর নামানুসারেই এই নতুন ভূখণ্ডের নাম রাখা হয় 'আমেরিকা' (America)।
উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের মাঝখানে যে একটি সংকীর্ণ ভূখণ্ড ছিল, যা দুটি মহাদেশকে যুক্ত করেছিল, তাকে পানামা যোজক (Isthmus of Panama) বলে। পরে এই যোজকটি কেটেই পানামা খাল তৈরি করা হয়েছে।
| পর্বতমালার নাম | অবস্থান ও প্রকৃতি |
|---|---|
| রকি পর্বতমালা (Rocky) | মহাদেশের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সুউচ্চ নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা। |
| অ্যাপালেশিয়ান পর্বত (Appalachian) | মহাদেশের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত প্রাচীন ও ক্ষয়প্রাপ্ত ভঙ্গিল পর্বতমালা। |
উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো মাউন্ট ম্যাককিনলে (Mount McKinley), যার বর্তমান নাম মাউন্ট দেনালে (৬১৯৪ মিটার)। এটি মহাদেশের উত্তর-পশ্চিমে আলাস্কা রেঞ্জে অবস্থিত।
পশ্চিমের শুষ্ক পার্বত্য অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় কলোরাডো নদীর প্রবল জলস্রোত শুষ্ক পাথরকে লম্বালম্বিভাবে ক্ষয় করেছে। এর ফলে নদী উপত্যকাটি অত্যন্ত গভীর ও সংকীর্ণ হয়ে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন নামক পৃথিবীর বৃহত্তম গিরিখাতের সৃষ্টি করেছে।
উত্তর আমেরিকার সেন্ট লরেন্স নদীর গতিপথে ইরি এবং অন্টারিও হ্রদের মাঝখানে বিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাত অবস্থিত। এই দুই হ্রদের জলতলের উচ্চতার পার্থক্যের কারণেই এই জলপ্রপাতটির সৃষ্টি হয়েছে।
উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মধ্য-পূর্বাংশে সেন্ট লরেন্স নদীর অববাহিকায় অবস্থিত পাঁচটি বড়ো হ্রদকে একত্রে পঞ্চহ্রদ বা গ্রেট লেকস বলা হয়।
হ্রদগুলি হলো: সুপিরিয়র, মিশিগান, হুরণ, ইরি এবং অন্টারিও (সহজে মনে রাখার সূত্র: HOMES)।
উত্তর আমেরিকার উত্তর-পূর্ব দিকে হাডসন উপসাগরকে কেন্দ্র করে 'V' আকৃতির যে এক বিস্তীর্ণ, অতি প্রাচীন এবং গ্রানাইট ও নিস শিলা দ্বারা গঠিত মালভূমি অঞ্চল রয়েছে, তাকেই কানাডীয় শিল্ড (Canadian Shield) বা লরেন্সীয় মালভূমি বলে। এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ভূখণ্ড।
হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলে সৃষ্ট তিনটি বড়ো হ্রদ হলো: গ্রেট বিয়ার, গ্রেট স্লেভ এবং আথাবাস্কা।
হ্রদ অঞ্চলের শীতল ও আর্দ্র জলবায়ু হ্রস্ব তৃণ ও ক্লোভার ঘাস জন্মানোর জন্য অত্যন্ত উপযোগী, যা গবাদি পশুর উৎকৃষ্ট খাদ্য। তাই এই অঞ্চলে (যেমন উইসকনসিন প্রদেশ) প্রচুর পশুপালন করা হয় এবং উন্নত মানের দুধ, মাখন, পনির উৎপাদন বা ডেয়ারি শিল্প গড়ে উঠেছে।
প্রচুর গবাদি পশু ও শূকর পালনের সুবিধা থাকায় হ্রদ অঞ্চলের শিকাগো (Chicago) শহরে মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকিং করার বিশাল শিল্প গড়ে উঠেছে। সারা বিশ্বে এখান থেকে মাংস রপ্তানি হয় বলে একে 'পৃথিবীর কসাইখানা' বলা হয়।
| খনিজ সম্পদ | প্রাপ্তিস্থান (খনি অঞ্চল) |
|---|---|
| আকরিক লোহা | সুপিরিয়র হ্রদের মেসাবি (Mesabi) ও ভারমিলিয়ন রেঞ্জ। |
| কয়লা | পেনসিলভ্যানিয়া, ইলিনয় এবং ইন্ডিয়ানা রাজ্য। |
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ (Pittsburgh) শহরটি তার অসংখ্য লৌহ-ইস্পাত কারখানার জন্য বিখ্যাত। এখানে এত বেশি ইস্পাত উৎপাদিত হয় যে, একে পৃথিবীর লৌহ-ইস্পাত রাজধানী বলা হয়।
ডেট্রয়েট (Detroit): মোটরগাড়ি নির্মাণ শিল্প (Automobile Industry)-এর জন্য বিশ্ববিখ্যাত।
অ্যাক্রন (Akron): টায়ার ও রবার শিল্পের জন্য বিখ্যাত, একে পৃথিবীর রবার রাজধানী বলা হয়।
কানাডীয় শিল্ড অঞ্চল খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানকার সাডবেরি (Sudbury) হলো পৃথিবীর বৃহত্তম নিকেল খনি। এছাড়া টিমিনস-এ সোনা, এবং ল্যাব্রাডর উপদ্বীপে প্রচুর আকরিক লোহা, ইউরেনিয়াম ও কোবাল্ট পাওয়া যায়।
১) নরম কাঠের জোগান: শিল্ড অঞ্চলের বিস্তীর্ণ তৈগা বনভূমিতে পাইন, ফার প্রভৃতি সরলবর্গীয় নরম কাঠের গাছ প্রচুর পাওয়া যায়, যা কাগজের মণ্ড তৈরির প্রধান কাঁচামাল।
২) জলবিদ্যুৎ ও পরিবহন: এখানকার খরস্রোতা নদীগুলোর জলবিদ্যুৎ এবং বরফ গলা নদীর জলে ভাসিয়ে সহজে কাঠ পরিবহন করার সুবিধা এই শিল্পকে উন্নত করেছে।
উত্তর আমেরিকার মধ্যভাগে (রকি পর্বতের পূর্বে এবং হ্রদ অঞ্চলের পশ্চিমে) এক বিস্তীর্ণ সমতলভূমি রয়েছে যা লম্বা ঘাসে ঢাকা। এই বিস্তীর্ণ তৃণাচ্ছাদিত প্রান্তরটিকেই প্রেইরি তৃণভূমি বলা হয়। এখানে ব্যাপক গম চাষ হয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মৃত উপত্যকা উত্তর আমেরিকার উষ্ণতম এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৬ মিটার নীচু (নিম্নতম) একটি স্থান। তীব্র গরম ও শুষ্কতার কারণে এখানে কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ বাঁচতে পারে না বলেই এর নাম মৃত উপত্যকা।
উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত এবং উত্তর আমেরিকান পাতের সংযোগস্থলে (অভিসারী পাত সীমানা) অবস্থিত। পাতগুলোর ক্রমাগত সংঘর্ষের কারণে এটি 'প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়'-এর অন্তর্গত, তাই এখানে প্রচুর ভূমিকম্প হয় এবং সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে।
উৎপত্তি: অন্টারিও হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়েছে।
পতনস্থল: উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে ফানেল আকৃতির মোহনা সৃষ্টি করে সেন্ট লরেন্স উপসাগরে (আটলান্টিক মহাসাগর) পতিত হয়েছে।
মিসিসিপি এবং মিসৌরি একত্রে উত্তর আমেরিকার দীর্ঘতম নদী প্রণালী (প্রায় ৬২৭৫ কিমি) গঠন করেছে। এর অববাহিকা অত্যন্ত উর্বর এবং নদীটি পাখির পায়ের মতো ব-দ্বীপ তৈরি করে মেক্সিকো উপসাগরে পতিত হয়েছে।
কলম্বাস যখন উত্তর আমেরিকায় পৌঁছান, তখন এখানকার স্থানীয় মানুষদের গায়ের রং তামাতে লাল দেখে তিনি মনে করেছিলেন যে তিনি ভারতে (India) পৌঁছেছেন। সেই ভুল ধারণা থেকেই এখানকার আদি অধিবাসীদের 'রেড ইন্ডিয়ান' বলা হয়।
উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলের পাশ দিয়ে উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত এবং উত্তর দিক থেকে শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত প্রবাহিত হওয়ায় এখানকার জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ প্রকৃতির। তবে শীতল স্রোতের প্রভাবে উত্তর-পূর্ব অংশ শীতকালে বরফাবৃত থাকে।
পঞ্চহ্রদ পার্শ্ববর্তী সমভূমিটি অত্যন্ত উর্বর। এটি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভুট্টা (Corn) উৎপাদক অঞ্চল। এছাড়া এখানে প্রচুর পরিমাণে গম, ওট, বার্লি, সয়াবিন এবং বিট চাষ হয়।
কানাডীয় শিল্ড মালভূমিটির দক্ষিণ অংশ দিয়ে সেন্ট লরেন্স নদী প্রবাহিত হয়েছে। সেন্ট লরেন্স নদীর অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় একে লরেন্সীয় মালভূমিও বলা হয়।
উত্তর আমেরিকার উত্তর-পূর্ব অংশে, কানাডীয় শিল্ড মালভূমির ঠিক মাঝখানে হাডসন উপসাগর (Hudson Bay) অবস্থিত। এই উপসাগরটিকে কেন্দ্র করেই মালভূমিটি V আকৃতি ধারণ করেছে।
ইরি হ্রদের তীরে অবস্থিত বাফেলো শহরটি পৃথিবীর বৃহত্তম ময়দা কল (Flour mill) এর জন্য বিখ্যাত। হ্রদ অঞ্চল ও প্রেইরির বিশাল গমের জোগান এবং পরিবহন সুবিধার কারণেই এখানে ময়দা শিল্পের উন্নতি হয়েছে।
উত্তর আমেরিকার উল্লেখযোগ্য প্রণালীগুলি হলো— উত্তর-পশ্চিমে বেরিং প্রণালী (এশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে) এবং উত্তর-পূর্বে গ্রিনল্যান্ডের কাছে ডেভিস প্রণালী।
পঞ্চহ্রদ অঞ্চলটি হিমযুগ বা বরফ যুগে বিশালাকার হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট অবনমিত স্থান। পরে বরফ গলে গিয়ে এই স্থানগুলো জলে পূর্ণ হয়ে হ্রদের সৃষ্টি করেছে। তাই এদের জলের মূল উৎস বরফগলা জল।
উত্তর আমেরিকা মহাদেশটি সম্পূর্ণভাবে উত্তর গোলার্ধ এবং পশ্চিম গোলার্ধে অবস্থিত। এটি নিরক্ষরেখার উত্তর থেকে সুমেরু মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যভাগ দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা (২৩.৫° উঃ) প্রসারিত হয়েছে।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
10 টিপ্রধান ভূপ্রাকৃতিক বিভাগ:
উত্তর আমেরিকা মহাদেশকে ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১) পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল বা কর্ডিলেরা
২) পূর্বের উচ্চভূমি অঞ্চল (অ্যাপালেশিয়ান)
৩) মধ্যভাগের বিস্তীর্ণ সমভূমি অঞ্চল
৪) কানাডীয় শিল্ড অঞ্চল।
পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল (Western Cordillera):
- অবস্থান ও গঠন: মহাদেশের পশ্চিম উপকূল বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা অবস্থিত। এটি রকি, কাসকেড, সিয়েরা নেভাদা এবং কোস্ট রেঞ্জ প্রভৃতি সমান্তরাল পর্বতশ্রেণির সমন্বয়।
- সর্বোচ্চ শৃঙ্গ: আলাস্কা রেঞ্জের মাউন্ট ম্যাককিনলে বা মাউন্ট দেনালে (৬১৯৪ মিটার) এই অঞ্চলের এবং সমগ্র উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
- ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য: এই অঞ্চলটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়ের অন্তর্গত, তাই এখানে অসংখ্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ও ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়। এখানে রকি পর্বতের মাঝে কলোরাডো মালভূমি, গ্রেট বেসিন প্রভৃতি অন্তর্দেশীয় মালভূমি রয়েছে।
- নদী ও গিরিখাত: কলোরাডো নদী এই পার্বত্য অঞ্চলের শুষ্ক অংশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পৃথিবীর বিখ্যাত এবং গভীরতম গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন (Grand Canyon) গিরিখাতের সৃষ্টি করেছে।
হ্রদ অঞ্চল (Great Lakes Region):
উত্তর আমেরিকার মধ্য-পূর্ব অংশে সেন্ট লরেন্স নদীর অববাহিকায় পাঁচটি বিশাল হ্রদ (সুপিরিয়র, মিশিগান, হুরণ, ইরি, অন্টারিও) একত্রে অবস্থান করছে। এই পঞ্চহ্রদ এবং তার পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ সমভূমিকে হ্রদ অঞ্চল বলা হয়।
শিল্পোন্নতির কারণসমূহ:
হ্রদ অঞ্চলটি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও উন্নত শিল্পাঞ্চল। এর কারণ হলো:
- খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য: মেসাবি ও ভারমিলিয়ন খনি থেকে প্রচুর আকরিক লোহা এবং পেনসিলভ্যানিয়া থেকে উন্নত মানের কয়লা পাওয়া যায়, যা লৌহ-ইস্পাত শিল্পের প্রধান ভিত্তি।
- কাঁচামালের জোগান: বিস্তীর্ণ কৃষিভূমি থেকে গম (ময়দা শিল্পের জন্য), পশুচারণ ক্ষেত্র থেকে মাংস ও দুধ (খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও ডেয়ারি শিল্পের জন্য) এবং তৈগা বনভূমি থেকে কাঠ শিল্পের কাঁচামাল পাওয়া যায়।
- পর্যাপ্ত জল ও জলবিদ্যুৎ: পঞ্চহ্রদ থেকে শিল্পের প্রয়োজনে অফুরন্ত পরিষ্কার জল পাওয়া যায় এবং নায়াগ্রা জলপ্রপাত ও খরস্রোতা নদীগুলো থেকে সস্তা জলবিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
- উন্নত পরিবহন: পঞ্চহ্রদ এবং সেন্ট লরেন্স নদীর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ জলপথ এবং আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় কম খরচে কাঁচামাল ও উৎপন্ন দ্রব্য পরিবহন করা যায়।
হ্রদ অঞ্চলের প্রধান শিল্প ও কেন্দ্রসমূহ:
প্রচুর খনিজ সম্পদ ও উন্নত পরিকাঠামোর কারণে হ্রদ অঞ্চলে বৈচিত্র্যময় শিল্প গড়ে উঠেছে:
| শিল্পের নাম | প্রধান শিল্পকেন্দ্র / শহর | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| লৌহ ও ইস্পাত শিল্প | পিটসবার্গ, ক্লিভল্যান্ড, গ্যারি | পিটসবার্গকে 'পৃথিবীর লৌহ-ইস্পাত রাজধানী' বলা হয়। |
| মোটরগাড়ি নির্মাণ শিল্প | ডেট্রয়েট | ডেট্রয়েট হলো মোটরগাড়ি শিল্পের বিশ্ব রাজধানী। |
| রবার ও টায়ার শিল্প | অ্যাক্রন | অ্যাক্রনকে 'পৃথিবীর রবার রাজধানী' বলা হয়। |
| মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্প | শিকাগো | শিকাগোকে 'পৃথিবীর কসাইখানা' বলা হয়। |
| ময়দা শিল্প | বাফেলো, শিকাগো | বাফেলোতে পৃথিবীর বৃহত্তম ময়দা কল অবস্থিত। |
| ডেয়ারি (দুগ্ধ) শিল্প | উইসকনসিন, মিলওয়াকি | প্রচুর পনির, মাখন ও দুধ উৎপাদিত হয়। |
কানাডীয় শিল্ড বা লরেন্সীয় মালভূমি:
উত্তর আমেরিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব অংশে, হাডসন উপসাগরকে ঘিরে 'V' আকৃতির যে বিশাল, প্রাচীন এবং শিলাময় মালভূমি রয়েছে, তাকে কানাডীয় শিল্ড অঞ্চল বলে।
অবস্থান:
এর উত্তরে সুমেরু মহাসাগর, পূর্বে ল্যাব্রাডর সাগর, দক্ষিণে পঞ্চহ্রদ ও সেন্ট লরেন্স নদী এবং পশ্চিমে গ্রেট বিয়ার, গ্রেট স্লেভ হ্রদ ও প্রেইরি সমভূমি অবস্থিত। এটি মূলত কানাডায় অবস্থিত।
ভূপ্রকৃতি:
- শিলাগঠন: এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ভূখণ্ড। মূলত প্রিক্যাম্ব্রিয়ান যুগের অত্যন্ত কঠিন আগ্নেয় (গ্রানাইট) ও রূপান্তরিত (নিস) শিলা দ্বারা এটি গঠিত।
- ক্ষয়প্রাপ্ত মালভূমি: দীর্ঘকাল ধরে হিমবাহ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তির ক্ষয়কাজের ফলে এখানকার উঁচু পর্বতগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে একটি তরঙ্গায়িত মালভূমিতে পরিণত হয়েছে।
- হ্রদের প্রাচুর্য: অতীতে বিশাল হিমবাহের ক্ষয়কাজে এই অঞ্চলে অসংখ্য ছোট-বড়ো গর্তের সৃষ্টি হয়। বরফ গলে সেই গর্তগুলোতে জল জমে গ্রেট বিয়ার, আথাবাস্কা, উইনিপেগ এর মতো অসংখ্য হ্রদের সৃষ্টি করেছে।
কাষ্ঠ ও কাগজ শিল্পের উন্নতির কারণ:
কানাডীয় শিল্ড অঞ্চল কাষ্ঠ আহরণ এবং কাগজ উৎপাদনে বিশ্বে অন্যতম শীর্ষস্থান অধিকার করে। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
- তৈগা বনভূমির অবস্থান: শিল্ড অঞ্চলের দক্ষিণ অংশে বিস্তীর্ণ সরলবর্গীয় তৈগা বনভূমি রয়েছে। এখানকার পাইন, ফার, লার্চ গাছের কাঠ খুব নরম, যা কাগজের মণ্ড (Pulp) তৈরির জন্য আদর্শ কাঁচামাল।
- বরফের সাহায্য (পরিবহন): শীতকালে চারিদিকে বরফ জমে গেলে গাছ কেটে বরফ ঢাকা নদীর ওপর ফেলে রাখা হয়। গ্রীষ্মকালে বরফ গলে নদীর স্রোত শুরু হলে, কাঠগুলো সহজে এবং বিনা খরচে ভাসতে ভাসতে নদী তীরবর্তী কাগজ কল ও কাঠচেরাই কলগুলোতে পৌঁছে যায়।
- জলবিদ্যুৎ: শিল্ড অঞ্চলের নদীগুলো অত্যন্ত খরস্রোতা হওয়ায় সেখান থেকে কারখানায় ব্যবহারের জন্য প্রচুর সস্তা জলবিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
- প্রচুর জল: কাগজ শিল্পে প্রচুর পরিষ্কার জলের প্রয়োজন হয়। শিল্ড অঞ্চলের অসংখ্য হ্রদ এবং নদী সেই জলের চাহিদা মেটায়।
কানাডীয় শিল্ডের খনিজ সম্পদ:
কৃষিকাজে অনুন্নত হলেও কানাডীয় শিল্ড অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম খনিজ সমৃদ্ধ এলাকা। প্রাচীন আগ্নেয় শিলায় গঠিত হওয়ায় এখানে প্রচুর ধাতব খনিজ পাওয়া যায়।
- নিকেল: ওন্টারিও প্রদেশের সাডবেরি (Sudbury) হলো পৃথিবীর বৃহত্তম নিকেল খনি। কানাডা নিকেল উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম সারিতে রয়েছে।
- সোনা: টিমিনস (Timmins) অঞ্চলে প্রচুর সোনা পাওয়া যায়।
- আকরিক লোহা: কুইবেক এবং ল্যাব্রাডর উপদ্বীপে উচ্চমানের লৌহ-আকরিক পাওয়া যায়।
- অন্যান্য খনিজ: এছাড়া সাডবেরি ও থম্পসন থেকে তামা, এবং উত্তরের হ্রদ অঞ্চল থেকে ইউরেনিয়াম, কোবাল্ট, রূপো, এবং প্ল্যাটিনাম উত্তোলিত হয়।
এই প্রচুর খনিজ সম্পদের ওপর ভিত্তি করেই শিল্ড অঞ্চলে উন্নত ধাতু-নিষ্কাশন এবং ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প গড়ে উঠেছে।
উত্তর আমেরিকার প্রধান নদনদী:
উত্তর আমেরিকার ভূপ্রকৃতি এবং অর্থনীতির ওপর এখানকার নদীগুলোর প্রভাব অপরিসীম।
- মিসিসিপি-মিসৌরি নদী: এটি উত্তর আমেরিকার দীর্ঘতম নদী প্রণালী (৬২৭৫ কিমি)। মিসিসিপির উৎপত্তি ইতাস্কা হ্রদ থেকে এবং মিসৌরির উৎপত্তি রকি পর্বত থেকে। এরা মধ্যভাগের সমভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাখির পায়ের মতো ব-দ্বীপ গঠন করে মেক্সিকো উপসাগরে পতিত হয়েছে।
- সেন্ট লরেন্স নদী: এটি পঞ্চহ্রদকে আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। অন্টারিও হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি ফানেল আকৃতির মোহনা তৈরি করেছে। এর গতিপথেই বিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাত অবস্থিত।
- কলোরাডো নদী: রকি পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমের শুষ্ক অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পড়েছে। এই নদীর খাড়া ক্ষয়কাজের ফলেই বিশ্ববিখ্যাত গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন গিরিখাতের সৃষ্টি হয়েছে।
- অন্যান্য নদী: হাডসন, ম্যাকেঞ্জি (উত্তরে প্রবাহিত), ইউকন (আলাস্কায়), এবং কলম্বিয়া।
নায়াগ্রা জলপ্রপাত (Niagara Falls) সৃষ্টি:
সেন্ট লরেন্স নদীর অববাহিকায় অবস্থিত পঞ্চহ্রদের জল একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়। ইরি হ্রদ থেকে জল যখন সেন্ট লরেন্স নদী দিয়ে অন্টারিও হ্রদের দিকে যায়, তখন নদীর পথে প্রায় ১০০ মিটারের একটি খাড়া ঢাল বা উচ্চতার পার্থক্য রয়েছে। ইরি হ্রদের জল এই খাড়া ঢাল বেয়ে বিপুল বেগে নীচে অন্টারিও হ্রদে আছড়ে পড়ার কারণেই বিশ্ববিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়েছে।
গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন (Grand Canyon) সৃষ্টি:
উত্তর আমেরিকার পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চলে কলোরাডো নদী প্রবাহিত হয়েছে। এই অঞ্চলটি অত্যন্ত শুষ্ক হওয়ায় বৃষ্টিপাত কম হয়, ফলে নদীর জলের পার্শ্বক্ষয় কম হয়। কিন্তু কলোরাডো নদীর প্রবল জলস্রোত শুষ্ক ও কঠিন পাথরকে শুধু নীচের দিকে (লম্বালম্বিভাবে) প্রবলভাবে ক্ষয় করেছে। হাজার হাজার বছর ধরে এই গভীর নিম্নক্ষয়ের ফলেই নদী উপত্যকাটি অত্যন্ত গভীর এবং সংকীর্ণ বা 'I' আকৃতির হয়ে পৃথিবীর দীর্ঘতম ও গভীরতম গিরিখাত গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন সৃষ্টি করেছে।
কৃষিকাজ:
হ্রদ অঞ্চলের আশেপাশের সমতলভূমি অত্যন্ত উর্বর, যা কৃষিকাজের জন্য আদর্শ।
- ভুট্টা (Corn): ইরি এবং মিশিগান হ্রদের দক্ষিণের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রচুর ভুট্টা চাষ হয়। এটি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভুট্টা উৎপাদক অঞ্চল বা 'Corn Belt'।
- অন্যান্য ফসল: এছাড়া প্রচুর পরিমাণে গম, ওট, বার্লি, সয়াবিন এবং বিট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করা হয়। গমের প্রাচুর্যের জন্যই বাফেলোতে পৃথিবীর বৃহত্তম ময়দা কল গড়ে উঠেছে।
পশুপালন ও ডেয়ারি শিল্প:
- এখানকার শীতল ও আর্দ্র জলবায়ু গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ক্লোভার ঘাস জন্মানোর অনুকূল।
- উইসকনসিন এবং মিশিগান প্রদেশে প্রচুর গবাদি পশু পালন করে দুধ, মাখন, পনির উৎপাদন করা হয়।
- ভুট্টা বলয়ে পশুদের ভুট্টা খাইয়ে মোটাতাজা করে শিকাগো শহরের বিশাল মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে (Slaughterhouse) পাঠানো হয়।
জলবায়ু ও স্বাভাবিক উদ্ভিদের বৈচিত্র্য:
বিশাল অক্ষাংশগত বিস্তৃতির কারণে উত্তর আমেরিকায় জলবায়ু ও উদ্ভিদের দারুণ বৈচিত্র্য দেখা যায়:
- তুন্দ্রা জলবায়ু: একেবারে উত্তরের সুমেরু বৃত্ত সংলগ্ন এলাকায় (কানাডা, আলাস্কা, গ্রিনল্যান্ড) তীব্র শীত থাকে। তাই এখানে গাছপালা জন্মায় না, শুধু গ্রীষ্মকালে কিছু শৈবাল, মস, লাইকেন (তুন্দ্রা উদ্ভিদ) দেখা যায়।
- তৈগা বনভূমি: তুন্দ্রার ঠিক দক্ষিণে কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলে শীতল নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু দেখা যায়। এখানে নরম কাঠের পাইন, ফার, স্প্রুস গাছের সুবিশাল সরলবর্গীয় বা 'তৈগা' বনভূমি রয়েছে।
- প্রেইরি তৃণভূমি: মহাদেশের মধ্যভাগে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় সেখানে বড়ো গাছ না জন্মে লম্বা ঘাসের সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রেইরি তৃণভূমি নামে পরিচিত (বর্তমানে এখানে প্রচুর গম চাষ হয়)।
- ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু: ক্যালিফোর্নিয়ার পশ্চিম উপকূলে গ্রীষ্মকাল শুষ্ক থাকে এবং শীতকালে পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয়। এখানে ওক, কর্ক, জলপাই, কমলালেবু, আঙুর প্রভৃতি ভূমধ্যসাগরীয় উদ্ভিদ দেখা যায়।
- উষ্ণ মরু জলবায়ু: মেক্সিকো ও ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু অংশে অত্যন্ত শুষ্ক মরু জলবায়ু থাকায় সেখানে ক্যাকটাস, ফণীমনসা জাতীয় কাঁটাগাছ জন্মায়।
মনে রেখো! (Key Points)
১) নায়াগ্রা জলপ্রপাত: সেন্ট লরেন্স নদীতে, ইরি ও অন্টারিও হ্রদের মাঝে অবস্থিত।
২) পঞ্চহ্রদ (Great Lakes): সহজে মনে রাখতে HOMES (Huron, Ontario, Michigan, Erie, Superior)।
৩) পিটসবার্গ: লৌহ-ইস্পাত রাজধানী এবং শিকাগো: পৃথিবীর কসাইখানা।
৪) কানাডীয় শিল্ড: প্রাচীন শিলাময় মালভূমি, খনিজ সম্পদে (নিকেল, লোহা) ও কাগজ শিল্পে অত্যন্ত উন্নত।