Chapter 2: অস্থিত পৃথিবী (Restless Earth)
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 30 MCQ | 22 SAQ | 8 Broad Questions
প্যানজিয়া
প্রায় ৩০ কোটি বছর আগের একক মহাদেশ
আগ্নেয়গিরি
ম্যাগমা নির্গমনের প্রক্রিয়া ও উৎস
ভূমিকম্প
স্থিতিস্থাপক শক্তি হঠাৎ মুক্তি
সতর্কতা
বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধ
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
30 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
22 টিআলফ্রেড ওয়েগনারের 'মহীসঞ্চরণ তত্ত্ব' অনুসারে, প্রায় ৩০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর সমস্ত স্থলভাগ একত্রিত হয়ে 'প্যানজিয়া' (Pangaea) নামক একটি বিশাল ভূখণ্ডের অবস্থান করত। পরবর্তীকালে প্যানজিয়া ভেঙে গিয়ে বিভিন্ন দিকে সঞ্চারিত হয়ে বর্তমান মহাদেশগুলির সৃষ্টি হয়।
মহাদেশীয় ভূত্বক (SIAL) মহাসাগরীয় ভূত্বকের (SIMA) ওপর ভাসমান অবস্থায় সরে গেছে। তবে এই তত্ত্ব থেকে মহাদেশ-মহাসাগর সৃষ্টি ও পর্বত গঠনের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পাত সংস্থান তত্ত্ব অনুসারে, পৃথিবীর ভূত্বক কয়েকটি অনমনীয় ও কঠিন খণ্ডে বিভক্ত, যাদের 'পাত' (Plate) বলা হয়। এই পাতগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে গুরুমন্ডলের অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার স্তর পর্যন্ত ৭০-১৩০ কিমি পুরু।
অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের পরিচলন স্রোতের কারণে পাতগুলো অতি ধীরগতিতে বিভিন্ন দিকে সঞ্চরণ করে। পাত সীমানা বরাবর ভূমিকম্প, অগ্নুৎপাত, পর্বত সৃষ্টি, সমুদ্রখাত ইত্যাদি ঘটে। ১৯৬০-এর দশকে এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পায়।
অপসারী বা গঠনকারী পাত সীমানা: যখন দুটি পাত পরস্পর বিপরীত দিকে বা দূরে সরে যায়, তখন তাকে অপসারী সীমানা বলে।
ফলাফল: এর ফলে সমুদ্রতলদেশে ফাটল সৃষ্টি হয় এবং ভূঅভ্যন্তরের ম্যাগমা ক্রমাগত বেরিয়ে এসে ঠান্ডা ও কঠিন হয়ে নতুন ভূত্বক ও মধ্য-সামুদ্রিক শৈলশিরা গঠন করে। এই অঞ্চলে ভূমিকম্প ও অগ্নুৎপাত স্বাভাবিক ঘটনা। (যেমন— আটলান্টিক মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ)।
অভিসারী বা বিনাশকারী পাত সীমানা: যখন দুটি পাত পরস্পরের দিকে অগ্রসর হয় এবং সংঘর্ষ ঘটে। ভারী পাত হালকা পাতের নীচে প্রবেশ করে (সাবডাকশন), যার ফলে ভূত্বকের বিনাশ ঘটে এবং সমুদ্রখাত সৃষ্টি হয়।
প্রকারভেদ:
১) সামুদ্রিক-সামুদ্রিক: জাপান ও ফিলিপাইনের আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ সৃষ্টি।
২) সামুদ্রিক-মহাদেশীয়: রকি ও আন্দিজ পর্বতমালা সৃষ্টি।
৩) মহাদেশীয়-মহাদেশীয়: ইউরেশিয় ও ভারতীয় পাতের সংঘর্ষে হিমালয় পর্বত সৃষ্টি।
নিরপেক্ষ পাত সীমানা: কখনো কখনো দুটি পাত পরস্পরকে ঘর্ষণ করে পাশাপাশি অগ্রসর হয়। এক্ষেত্রে ভূমিকম্প ও চ্যুতি সৃষ্টি হয়, কিন্তু পাতের ধ্বংস বা সৃষ্টি কিছুই হয় না, তাই একে নিরপেক্ষ সীমানা বলে। এটি ট্রান্সফর্ম ফল্ট নামেও পরিচিত।
উদাহরণ: ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত সান আন্দ্রেয়াস চ্যুতি (San Andreas Fault), যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত উত্তর দিকে এবং উত্তর আমেরিকা পাত দক্ষিণ দিকে সরছে।
দুটি মহাদেশীয় পাত— ইউরেশিয় পাত ও ভারতীয় পাতের সংঘর্ষে হিমালয় পর্বত সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতীয় পাত উত্তর দিকে সরে গিয়ে ইউরেশিয় পাতের নীচে প্রবেশ করে। প্রবল সংঘর্ষের ফলে দুই পাতের মধ্যবর্তী টেথিস সাগরের পলি প্রচণ্ড চাপে ভাঁজ হয়ে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়া এখনও চলছে বলে নবীন ভঙ্গিল পর্বত হিমালয়ের উচ্চতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অগ্ন্যুদ্গম (Volcanism): ভূঅভ্যন্তরের গলিত সান্দ্র ম্যাগমা, গ্যাস, জলীয়বাষ্প কোনো ফাটল বা গহ্বরের মধ্য দিয়ে প্রচণ্ড জোরে অথবা ধীর ও শান্তভাবে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াকে অগ্ন্যুদ্গম বলে।
আগ্নেয়গিরি (Volcano): অগ্ন্যুৎপাতের উৎস মুখ বা জ্বালামুখগুলোকে আগ্নেয়গিরি বলা হয়। বারবার অগ্ন্যুৎপাতে নির্গত পদার্থ জ্বালামুখের চারপাশে জমা হয়ে শঙ্কু আকৃতির পর্বত গঠন করে, যা আগ্নেয় পর্বত (যেমন ফুজিয়ামা) নামে পরিচিত।
| পার্থক্য | ম্যাগমা (Magma) | লাভা (Lava) |
|---|---|---|
| অবস্থান | ভূগর্ভে গুরুমন্ডলের অভ্যন্তরে অবস্থান করে। | ভূপৃষ্ঠের বাইরে নির্গত হয়। |
| গ্যাস ও বাষ্প | প্রচুর গ্যাস ও জলীয়বাষ্প থাকে এবং চাপে আবদ্ধ থাকে। | ভূপৃষ্ঠে এলে গ্যাস ও বাষ্প বাতাসে মিশে যায়। |
| সংজ্ঞা | ভূ-অভ্যন্তরে গলিত বা আধা-গলিত সান্দ্র পদার্থ। | ম্যাগমাই যখন ভূ-পৃষ্ঠের বাইরে নির্গত হয়। |
সক্রিয়তার ভিত্তিতে আগ্নেয়গিরি তিন প্রকার:
| প্রকারভেদ | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সক্রিয় (Active) | সৃষ্টির পর থেকে অবিরাম বা প্রায়শই অগ্নুৎপাত ঘটায়। | সিসিলির এটনা, ভারতের ব্যারেন |
| সুপ্ত (Dormant) | দীর্ঘকাল নিষ্ক্রিয় থাকার পর হঠাৎ জেগে ওঠে। | জাপানের ফুজিয়ামা, ক্রাকাতোয়া |
| মৃত (Extinct) | প্রাচীনকালে অগ্নুৎপাত ঘটালেও, ভবিষ্যতে সম্ভাবনা প্রায় নেই। | মেক্সিকোর পারিকুতিন, মায়ানমারের পোপা |
অগ্ন্যুদ্গমকে 'ভূগাঠনিক প্রক্রিয়া' বলা হয় কারণ এর মাধ্যমে পৃথিবীর ভূমিরূপ গঠন ও পরিবর্তিত হয়।
উৎক্ষিপ্ত লাভা, ছাই, আগ্নেয় পদার্থ স্তরে স্তরে জমে শীতল ও কঠিন হয়ে ভূত্বকের অনেকটা অংশ গঠন করেছে। এর ফলেই আগ্নেয় পর্বত (ফুজিয়ামা), লাভা মালভূমি (দাক্ষিণাত্য মালভূমি) ও লাভা সমভূমি সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সৃষ্টির আদিলগ্নে অগ্ন্যুদ্গমের জলীয়বাষ্প থেকেই সাগর-মহাসাগরের জল সৃষ্টি হয়েছে।
ভূমিকম্প (Earthquake): পৃথিবীর স্থিতিস্থাপক অভ্যন্তরে কোনো সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্তি পেলে ভূত্বক কেঁপে ওঠে— একেই ভূমিকম্প বলে।
উৎপত্তি: প্রধানত পাত সঞ্চালনের সময় শিলায় পুঞ্জীভূত পীড়ন (stress) সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে আকস্মিক ভাবে শিলাচ্যুতি ঘটে এবং স্থিতিস্থাপক শক্তি তরঙ্গ আকারে মুক্ত হয়। এছাড়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, গহ্বর ধস, খনি ও বাঁধ নির্মাণ প্রভৃতি কারণেও ভূমিকম্প হয়।
কেন্দ্র বা ফোকাস (Focus): ভূপৃষ্ঠের নীচে ভূঅভ্যন্তরের যে স্থান থেকে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, অর্থাৎ যেখানে শক্তি প্রাথমিকভাবে মুক্ত হয়। এটি সাধারণত ৫০-১০০ কিমি গভীরে অবস্থিত।
উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টার (Epicentre): ভূমিকম্প কেন্দ্র থেকে ঠিক উল্লম্বভাবে ভূপৃষ্ঠের ওপরের বিন্দুতে কম্পন প্রথম পৌঁছায়, তাকে উপকেন্দ্র বলে। উপকেন্দ্রেই ভূমিকম্পের অভিঘাত সর্বাধিক তীব্র হয় এবং ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি ঘটে।
ভূমিকম্প তরঙ্গ (Seismic Wave) তিন প্রকার:
| তরঙ্গ | গতিবেগ | মাধ্যম | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| প্রাথমিক (P wave) | সবচেয়ে দ্রুত (৬ কিমি/সে.) | কঠিন, তরল, গ্যাসীয় | সবার আগে পৌঁছায়, ক্রম-সংকোচন-প্রসারণে চলাচল করে। |
| দ্বিতীয় পর্যায় (S wave) | মাঝারি (৩-৫ কিমি/সে.) | শুধুমাত্র কঠিন | P-এর পরে আসে, কণার ওপর-নীচে ওঠানামায় প্রবাহিত। |
| পৃষ্ঠ (L wave) | কম (৩-৪ কিমি/সে.) | ভূপৃষ্ঠ বরাবর | লাভ ও রেলি তরঙ্গ নামে পরিচিত, সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। |
| বিষয় | P তরঙ্গ (Primary Wave) | S তরঙ্গ (Secondary Wave) |
|---|---|---|
| গতিবেগ | দ্রুততম (৬ কিমি/সেকেন্ড), ভূপৃষ্ঠে প্রথমে পৌঁছায়। | অপেক্ষাকৃত কম (৩-৫ কিমি/সেকেন্ড)। |
| মাধ্যম | কঠিন, তরল, গ্যাসীয় সব মাধ্যমে যায়। | শুধুমাত্র কঠিন পদার্থে চলে, তরল বা গ্যাসে যায় না। |
| প্রকৃতি | সংকোচন ও প্রসারণ (push-pull) তরঙ্গ। | কণার ওপরে-নীচে কম্পন (shear wave)। |
জ্ঞাতব্য: S তরঙ্গের তরলে চলতে না পারার ধর্ম কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্র তরল অবস্থায় রয়েছে।
পাতগুলো অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার স্তরের ওপর ভাসমান অবস্থায় বিভিন্ন গতিতে, অনুভূমিকভাবে সঞ্চারিত হয়।
এই চলন এতই ধীর এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলে যে, আমরা তা সরাসরি টের পাই না। যেমন— প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত বছরে ১০ সেমি পশ্চিমে সরে, অন্যদিকে আমেরিকান পাত বছরে মাত্র ২-৩ সেমি সরে। আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার বাইরে এই অতি ধীর গতি। তবে পাতের চলনের ফলস্বরূপ তৈরি হওয়া ভূমিকম্প বা অগ্নুৎপাত আমরা প্রত্যক্ষ করি।
ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস এখনো পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও পরিকল্পনা জীবনহানি কমাতে পারে।
সতর্কতা:
১) বাড়ির নকশা সরল ও ভূমিকম্প প্রতিরোধী করে নির্মাণ করা।
২) আপৎকালীন জিনিসপত্র (টর্চ, শুকনো খাবার, ফার্স্ট এইড, পানীয় জল) প্রস্তুত রাখা।
৩) কম্পন চলাকালে শক্ত টেবিল বা আসবাবের নীচে আশ্রয় নেওয়া।
৪) বহুতল বাড়ির লিফট, সিঁড়ি, বারান্দা এড়িয়ে চলা এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খোলা জায়গায় চলে যাওয়া।
সুনামি একটি জাপানি শব্দ, যার অর্থ 'পোতাশ্রয়ের ঢেউ'।
সমুদ্রের তলদেশে প্রবল ভূমিকম্প (সাধারণত ৭.০ রিখটারের বেশি), অগ্নুৎপাত বা বিশাল ভূমিধ্বস হলে বিপুল শক্তি সঞ্চারিত হয়ে সমুদ্রে প্রচন্ড জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। এই সমুদ্র তরঙ্গ উপকূলে আছড়ে পড়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যেমন: ২০০৪ সালে সুমাত্রা উপকূলে ৮.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামি ১১টি দেশে প্রায় ৩ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়েছিল।
ভারতের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি হল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ব্যারেন (Barren) দ্বীপে অবস্থিত ব্যারেন আগ্নেয়গিরি।
এটি ১৮৫২ সালের পর দীর্ঘকাল সুপ্ত ছিল, কিন্তু ১৯৯১ সালে পুনরায় সক্রিয় হয়ে অগ্নুৎপাত ঘটায়। এরপর ২০০৫, ২০১৭ এবং সাম্প্রতিক কালেও এর থেকে লাভা নির্গত হতে দেখা গেছে। ব্যারেন আগ্নেয়গিরিটি অভিসারী পাত সীমানায় ইন্ডো-অস্ট্রেলিয় পাতের সাবডাকশন অঞ্চলের ওপর অবস্থিত।
বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক যুগে অগ্ন্যুদ্গমের মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়ে বর্তমানের অনুকূল অবস্থায় পৌঁছেছে।
প্রাচীন অগ্ন্যুৎপাত থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প প্রাথমিক গ্রিনহাউজ তৈরি করে পৃথিবীকে উষ্ণ রেখেছিল। আবার বড় অগ্ন্যুৎপাতে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ছাই বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে শীতল (Volcanic Winter) করেছিল। এই প্রক্রিয়ায় জীবনের উপযোগী আদর্শ তাপমাত্রা বজায় রয়েছে।
পৃথিবীতে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে অনেকগুলো পাত থাকলেও প্রধান ৬টি বৃহৎ পাত হল:
(১) ইউরেশিয় পাত (Eurasian Plate)
(২) ইন্ডো-অস্ট্রেলিয় পাত (Indo-Australian Plate)
(৩) উত্তর আমেরিকা পাত (North American Plate)
(৪) দক্ষিণ আমেরিকা পাত (South American Plate)
(৫) প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত (Pacific Plate)
(৬) আফ্রিকা পাত (African Plate)।
এছাড়া আন্টার্কটিকা, নাজকা, ক্যারিবিয়ান প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য ছোটো পাত রয়েছে।
হাওয়াই দ্বীপের স্থানীয় ভাষায় ব্যাসল্ট লাভার দুইটি প্রকারভেদ রয়েছে:
| লাভার ধরন | বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি |
|---|---|
| 'আ আ' (A'a) | গাঢ়, আঠালো ও খুব ধীরে প্রবাহিত লাভা, যা দ্রুত ঠান্ডা হয়ে খসখসে, ভাঙা ও ধারালো পৃষ্ঠ তৈরি করে। |
| 'পা হো হো' (Pahoehoe) | অত্যন্ত পাতলা, তরল ও দ্রুতগতিতে প্রবাহিত লাভা, যার উপরিভাগ ঠান্ডা হয়ে দড়ির মতো কুঁচকানো বা পাকানো আকার ধারণ করে। |
| পর্বতের ধরন | সৃষ্টির সময়কাল | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| নবীন ভঙ্গিল পর্বত | ১-২.৫ কোটি বছর আগে | উচ্চতা বেশি, চূড়া তীক্ষ্ণ, ক্ষয় কম হয়েছে। | রকি, আন্দিজ, আল্পস, হিমালয় |
| প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত | ২০ কোটি বছরেরও আগে | দীর্ঘকাল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে উচ্চতা কম ও চূড়া গোলাকার। | উরাল, অ্যাপালেশিয়ান, আরাবল্লী |
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
8 টিপাত সংস্থান তত্ত্ব (Plate Tectonic Theory)
১৯৬০-এর দশকে পিঁতো, উইলসন, ম্যাকেনজি প্রমুখ বিজ্ঞানীরা প্রতিষ্ঠা করেন যে, পৃথিবীর ভূত্বক ও ঊর্ধ্ব গুরুমন্ডল মিলে গঠিত অনমনীয় খণ্ডকে 'পাত' (Plate) বলে। এগুলো অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের ওপর ভাসমান এবং পরিচলন স্রোতে ধীরগতিতে সঞ্চরণ করে।
পাত সীমানার প্রকারভেদ:
- অপসারী সীমানা (Divergent): দুটি পাত পরস্পর বিপরীত দিকে সরে যায় → ভূত্বকের ফাটল দিয়ে ম্যাগমা বেরিয়ে নতুন ভূত্বক সৃষ্টি → মধ্য-সামুদ্রিক শৈলশিরা (Mid-Atlantic Ridge) গঠিত।
- অভিসারী সীমানা (Convergent): দুটি পাত মুখোমুখি এলে:
- মহাসাগরীয়-মহাসাগরীয় → দ্বীপপুঞ্জ (জাপান)
- মহাসাগরীয়-মহাদেশীয় → ভঙ্গিল পর্বত (রকি, আন্দিজ)
- মহাদেশীয়-মহাদেশীয় → সুউচ্চ পর্বত (হিমালয়)
- নিরপেক্ষ সীমানা (Conservative/Transform): পাশাপাশি ঘর্ষণ করে সরলে চ্যুতি ও ভূমিকম্প হয়। যেমন— সান আন্দ্রেয়াস চ্যুতি।
পাত সীমানাগুলোই পৃথিবীর প্রধান ভূমিকম্প ও অগ্নুৎপাত বলয় নির্দেশ করে।
ওয়েগনারের মহীসঞ্চরণ তত্ত্ব বনাম পাত সংস্থান তত্ত্ব
| বৈশিষ্ট্য | মহীসঞ্চরণ তত্ত্ব | পাত সংস্থান তত্ত্ব |
|---|---|---|
| প্রবক্তা | আলফ্রেড ওয়েগনার (১৯১২) | ম্যাকেনজি, পার্কার, মর্গান (১৯৬০) |
| মূল ধারণা | মহাদেশগুলো সরে গেছে (SIAL SIMA-র ওপর) | সমগ্র ভূত্বক কয়েকটি পাত খণ্ডে বিভক্ত এবং সবগুলোই নড়ে |
| চালিকাশক্তি | পৃথিবীর আবর্তন ও জোয়ারভাটা (অসন্তোষজনক) | গুরুমন্ডলের পরিচলন স্রোত (পরিমাপযোগ্য) |
| প্রমাণ | উপকূলের জিগ-স মিল, জীবাশ্ম, শিলা | সামুদ্রিক শৈলশিরা, প্যালিওম্যাগনেটিজম, সরাসরি GPS পরিমাপ |
| সীমাবদ্ধতা | সমুদ্রের তলদেশের প্রসারণ, পর্বত গঠন ব্যাখ্যা করতে পারেনি | সব ভূপ্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যায় সক্ষম |
ওয়েগনার বলতে পারেননি কীভাবে মহাদেশগুলো সিমার ওপর দিয়ে চলছে। পাত তত্ত্বে পরবর্তীতে সমুদ্রতলের প্রসারণ (Sea Floor Spreading) ও পরিচলন স্রোতের ধারণা বিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করে। আধুনিক GPS পরিমাপ আজ পাতগুলোর চলাচল প্রমাণ করে।
আগ্নেয়গিরি ও অগ্ন্যুদ্গম
পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রচণ্ড তাপে শিলা গলে ম্যাগমা সৃষ্টি হয়। গুরুমন্ডলের ঘনত্ব কম ম্যাগমা হালকা হওয়ায় ওপরে উঠতে থাকে। ওপরে চাপ কমায় ম্যাগমার জলীয় অংশ গ্যাস ও বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে প্রবল চাপে ভূপৃষ্ঠের দুর্বল ফাটল দিয়ে উৎক্ষিপ্ত হয়— একেই অগ্ন্যুদ্গম বলে।
শ্রেণিবিভাগ (সক্রিয়তা অনুসারে):
- সক্রিয় (Active): সবসময় বা ঘন ঘন অগ্নুৎপাত হয় (এটনা, ব্যারেন, কিলাওয়া)।
- সুপ্ত (Dormant): দীর্ঘকাল শান্ত থেকে আবার জেগে ওঠে (ফুজিয়ামা, ক্রাকাতোয়া)।
- মৃত (Extinct): প্রাচীনকালে অগ্নুৎপাত করলেও এখন আর সম্ভাবনা নেই (পোপা, পারিকুতিন)।
ভূমিরূপে ভূমিকা:
উৎক্ষিপ্ত লাভা, ছাই স্তরে স্তরে জমে ঠান্ডা হয়ে সৃষ্টি করে আগ্নেয় পর্বত (ফুজিয়ামা) এবং লাভা মালভূমি (দাক্ষিণাত্য মালভূমি)। এছাড়াও সৃষ্টির শুরুতে আগ্নেয়গিরির নির্গত বাষ্প থেকে সাগর-মহাসাগরের জল সৃষ্টি হয়েছে এবং বায়ুমন্ডলের গঠন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। তাই অগ্ন্যুদ্গম এক 'ভূগাঠনিক প্রক্রিয়া'।
ভূমিকম্প (Earthquake)
ভূঅভ্যন্তরে সঞ্চিত বিপুল স্থিতিস্থাপক শক্তির আকস্মিক মুক্তির ফলে ভূত্বক কেঁপে ওঠাকে ভূমিকম্প বলে। এই মুক্তি তরঙ্গ আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রধান কারণ:
- পাত সঞ্চালন ও শিলায় পীড়ন (স্ট্রেস) বৃদ্ধি
- আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত
- ভূগর্ভস্থ গহ্বরের ধস
- কৃত্রিম: বড় বাঁধ, খনি, পারমাণবিক বিস্ফোরণ
কেন্দ্র (Focus) ও উপকেন্দ্র (Epicentre):
কেন্দ্র: ৫০-১০০ কিমি গভীরে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। উপকেন্দ্র: কেন্দ্রের ঠিক উপরে ভূপৃষ্ঠের বিন্দু — এখানে প্রথম কম্পন পৌঁছায় ও তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।
তরঙ্গ প্রকৃতি:
- P তরঙ্গ: দ্রুততম (৬ কিমি/সে.), কঠিন-তরল-গ্যাস সব জায়গায় যায়, সংকোচন-প্রসারণ তরঙ্গ।
- S তরঙ্গ: গতি কম (৩-৫ কিমি/সে.), শুধু কঠিন মাধ্যম, ওপর-নীচ কম্পন।
- L তরঙ্গ: পৃষ্ঠ বরাবর (৩-৪ কিমি/সে.), সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক।
ভূমিকম্প তরঙ্গের প্রতিফলন ও প্রতিসরণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠনের চিত্র পেয়েছেন।
১. হিমালয় পর্বত (মহাদেশীয়-মহাদেশীয় সংঘর্ষ):
প্রায় ৫-৭ কোটি বছর আগে ভারতীয় পাত (ইন্ডো-অস্ট্রেলিয় পাতের অংশ) উত্তর দিকে ইউরেশিয় পাতের সাথে ধাক্কা খায়। ভারতীয় পাতের সাবডাকশন না ঘটলেও মহাদেশীয় ভূত্বক ভাঁজ হয়ে দ্বিগুণ পুরু হয় এবং মধ্যবর্তী টেথিস সাগরের পলি ভাঁজ হয়ে উপরে উঠে আসে। ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ ভঙ্গিল পর্বত হিমালয় সৃষ্টি হয়। ভারতীয় পাত এখনও বছরে প্রায় ৫ সেমি উত্তরে সরছে, তাই হিমালয়ের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
২. জাপান দ্বীপপুঞ্জ (মহাসাগরীয়-মহাসাগরীয় সংঘর্ষ):
প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত ফিলিপাইন সাগরীয় পাতের নীচে এবং ইউরেশিয় পাতের নীচে সাবডাক্ট করছে। ভারী প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত নীচে গলে ম্যাগমা সৃষ্টি করে এবং সেই ম্যাগমা ওপরে উঠে দ্বীপ আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করে। এর ফলে জাপান, ফিলিপাইন, মারিয়ানা ইত্যাদি আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ বা দ্বীপমালা (Island Arc) এবং গভীর সমুদ্রখাত (Trench) সৃষ্টি হয়েছে। জাপান তাই 'প্রশান্ত অগ্নিবলয়'-এর (Pacific Ring of Fire) অংশ।
ভূমিকম্পে করণীয় (সচেতনতা ও বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা):
ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয় বলে পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতাই রক্ষাকবচ।
ভূমিকম্প চলাকালীন করণীয়:
- ঘরে থাকলে: টেবিল বা মজবুত আসবাবের নীচে 'ড্রপ, কভার, হোল্ড অন' পদ্ধতি মেনে চলো।
- বাইরে থাকলে: দালান, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছ থেকে দূরে খোলা জায়গায় যাও।
- গাড়িতে থাকলে: ব্রিজ, ওভারপাস এড়িয়ে খোলা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে ভেতরে অপেক্ষা করো।
- লিফট ব্যবহার করো এলাকা থেকে দূরে থাকো; আগুন নেভানোর যন্ত্র (অগ্নি নির্বাপক) কাছে রাখো।
ভূমিকম্প প্রতিরোধী বাড়ি নির্মাণ:
- বাড়ির নকশা সরল ও প্রতিসম (symmetrical) হওয়া দরকার।
- হালকা নির্মাণ সামগ্রী (কাঠ, বাঁশ, ইস্পাত) ব্যবহারে ওজন কম হয় → কম্পন কম অনুভূত।
- কোণায় ত্রিকোণাকার ব্রেসিং ও বেজ-আইসোলেটর (Base Isolator) ব্যবহার করলে ভূমিকম্পের শক্তি ভিত্তি থেকে উপরে কম পৌঁছায়।
- দুর্বল ভিত ও দেওয়াল মেরামত ও শক্তিশালী করতে হবে।
জরুরি কিটে টর্চ, ব্যাটারি, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ জল, ওষুধ ও ফার্স্টএইড বাক্স সবসময় প্রস্তুত রাখতে হবে।
মডেল পরীক্ষা: গরম জল ও ঠান্ডা জলের সাহায্যে
ছোট কাঁচের পাত্রে গরম রঙিন জল ভরে রাবার ব্যান্ড ও পলিথিন দিয়ে মুখ আটকিয়ে পেনসিল দিয়ে ২-৩টি ছিদ্র করো। এবার বড় পাত্রে ঠান্ডা জল নিয়ে ছোট পাত্রটিকে সম্পূর্ণ ডুবাও। ছোট পাত্রের ছিদ্র দিয়ে গরম রঙিন জল জোরে উপরে উঠে আসবে, ঠিক যেমন গলিত ম্যাগমা হালকা হয়ে ওপরের দিকে উঠে আসে ও ভূপৃষ্ঠে নির্গত হয়। গরম জল ও ঠান্ডা জলের ঘনত্বের পার্থক্যই পরিচলন স্রোতের মতো কাজ করে।
অগ্ন্যুদ্গম: সৃজনশীল ও ধ্বংসাত্মক
সৃজনশীল ভূমিকা: নতুন ভূমি ও দ্বীপ (হাওয়াই, আইসল্যান্ড) সৃষ্টি করে। দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণমৃত্তিকা (Black Soil) লাভা থেকে সৃষ্টি। সমুদ্রের জল ও বায়ুমন্ডলের গঠনে সাহায্য করেছে।
ধ্বংসাত্মক ভূমিকা: পম্পেই শহরের মতো জনপদ ধ্বংস, ফসলের ক্ষতি, বায়ুদূষণ, লাভা প্রবাহে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি। ক্রাকাতোয়ার অগ্নুৎপাতে (১৮৮৩) তিনটি শহর ধ্বংস ও সুনামি হয়েছিল।
প্যানজিয়া থেকে বর্তমান পৃথিবী
প্রায় ৩০ কোটি বছর আগে (পার্মিয়ান যুগ) পৃথিবীর সকল মহাদেশ যুক্ত হয়ে 'প্যানজিয়া' (Pangaea) নামক একক মহাদেশ সৃষ্টি করেছিল, যার চারপাশে ছিল 'প্যান্থালাসা' নামক একক মহাসমুদ্র। ট্রায়াসিক যুগে (২০-২২ কোটি বছর আগে) প্যানজিয়া ভেঙে উত্তর অংশ (লরেশিয়া) ও দক্ষিণ অংশ (গন্ডোয়ানা)-তে বিভক্ত হয় এবং মধ্যে টেথিস সাগরের সৃষ্টি হয়। ক্রিটেসিয়াস ও সেনোজোয়িক যুগে ভাঙন ও সঞ্চরণ অব্যাহত থেকে বর্তমান মহাদেশগুলোর অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
ওয়েগনারের প্রমাণ:
- জিগ-স পাজল ফিট: দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার উপকূলীয় আকৃতি জিগ-স পাজলের মতো খাপে খাপে মেলে।
- জীবাশ্মের সাদৃশ্য: মেসোসরাস (স্বাদু পানির সরীসৃপ) আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা— উভয় জায়গাতেই জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। গ্লসোপ্টেরিস নামক ফার্ন আফ্রিকা, অ্যান্টার্কটিকা, ভারত ও অস্ট্রেলিয়াতে পাওয়া যায়।
- শিলাগত মিল: ব্রাজিল ও পশ্চিম আফ্রিকার প্রাচীন শিলার গঠন, বয়স ও ধরন সম্পূর্ণ এক।
- হিমবাহের সাক্ষ্য: বর্তমান উষ্ণ অঞ্চল যেমন ভারত, আফ্রিকায় প্রাচীন হিমবাহের চিহ্ন পাওয়া গেছে যা বোঝায় তারা এক সময় দক্ষিণ মেরুর কাছে ছিল।
মনে রেখো!
পাত তিন ধরনের সীমানায় চলে: অপসারী (পৃথক হয়), অভিসারী (সংঘর্ষ হয়), নিরপেক্ষ (পাশাপাশি ঘর্ষণ)। হিমালয় ভারতীয় + ইউরেশিয় পাতের সংঘর্ষে সৃষ্ট। P তরঙ্গ সবচেয়ে দ্রুত (৬ কিমি/সে.), S তরঙ্গ তরল মাধ্যমে যায় না। লাভা = ভূপৃষ্ঠে নির্গত ম্যাগমা। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া যায় না — সতর্কতাই রক্ষাকবচ।